বেশ কয়েক বছর ধরে যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখনই অনেকেই সেই আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থিত থেকে যান, যারা আসলে সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার। আমি আজ কথা বলছি তাদের নিয়ে, যারা তিনটি পরিচয়ের জন্য তিন স্তরের নিপীড়ন ভোগ করেন নারী, হিন্দু এবং গরিব। আমাদের সমাজে একজন নারী হিসেবে বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ কম নয়। এর সাথে যদি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিচয় এবং গরিবির অভিশাপ যোগ হয়, তাহলে সেই চ্যালেঞ্জের মাত্রা যে দ্বিগুণ হয়ে যায়, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা বারবার শুনি নারী নির্যাতনের কথা। কিন্তু যখন সেই নারীর পরিচয় হিন্দু হয় এবং আর্থিকভাবে দুর্বল হয়, তখন তার উপর নিপীড়নের ভার যেন আরও বাড়ে। আমার মা বলতেন, “যখন তিনটি পরিচয় তোমার পেছনে তাড়া করে, তখন সমাজে বেঁচে থাকা একপ্রকার যুদ্ধের মতো।” ছোটবেলায় এর মানে বুঝতাম না। কিন্তু বড় হতে হতে বুঝলাম, সমাজে এই তিনটি পরিচয়ের জন্য কী চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়।
প্রথমত, নারী হিসেবে বাংলাদেশে বেঁচে থাকা মানেই একটি লড়াই। শহরের ফুটপাথে হাঁটলেও মানুষ তোমাকে নিরীক্ষণ করবে, তোমার হাঁটার গতি, পোশাক, কথা বলার ধরন সবকিছু নিয়ে মন্তব্য করবে। এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। তবে যখন তুমি হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী হও, তখন সমস্যা আরও জটিল হয়ে যায়। সামাজিক বৈষম্য এবং ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হতে হয় অনেকক্ষেত্রে। একবার আমার এক বান্ধবী বলেছিল তার মন্দিরে যাওয়ার সময় তার পাড়ার ছেলেরা তাকে কীভাবে কথা শুনিয়েছিল, কীভাবে তার ধর্মীয় উৎসবকে ছোট করার চেষ্টা করেছিল। তার সাথে যে আবেগের কথা বলেছিল, সেটা আজও আমার মনে গেঁথে আছে।
আর যদি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হও, তাহলে সেই নিপীড়নের স্তর এক ধাপ বাড়ে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক সময় নিজের অধিকার আদায়ের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। কাজের জায়গায় বা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। এই তিন পরিচয়ের জন্য আমাদের দেশে কতজন নারী যে প্রতিদিন এই সমস্যায় ভুগছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল।
তবে এর মানে এই নয় যে এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন যারা বিভিন্নভাবে এই নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। অনেক এনজিও এবং সামাজিক সংগঠন কাজ করছে তাদের অধিকার সুরক্ষিত করতে। তবে এই প্রচেষ্টা এখনও পর্যাপ্ত নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি আমাদের সবার মনোভাব পরিবর্তন না হয়, তাহলে এই অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হবে না।
এই সমস্যার সমাধান সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। প্রথমত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং মানবাধিকার সম্পর্কে আরও সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।তাছাড়া, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হলে সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থার আরও কার্যকরী ভূমিকা পালন করা উচিত। নারীর ক্ষমতায়ন, বিশেষ করে সংখ্যালঘু এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য বিশেষ কর্মসূচির প্রয়োজন।
এই লেখাটি পড়তে পড়তে অনেকের মনে হতে পারে যে আমি শুধু সমস্যারই কথা বলছি, সমাধানের কথা একেবারেই নেই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই সমস্যাগুলো সামনে আনাই হল প্রথম পদক্ষেপ। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সমস্যার কথা খুলে বলতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সমাধানের পথও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ যদি এই বিষয়ে সচেতন হয় এবং সঠিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে, তাহলে হয়তো একদিন আমরা এই তিন স্তরের নিপীড়নমুক্ত সমাজ গড়তে সক্ষম হব।
তবে প্রশ্ন থাকে, আমরা কি সত্যি এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? আমরা কি আসলেই চাই সমাজে এই বৈষম্য দূর হোক? নাকি কেবলমাত্র কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে মুখে মুখেই পরিবর্তনের আশা করি? আজকের সমাজ কি সত্যিই এই সমস্ত বিষয় নিয়ে ভাবতে প্রস্তুত? আপনাদের মতামত কী?
