আজকাল চায়ের আড্ডায় কিংবা ফেসবুকের নিউজ ফিড স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ করে চোখে পড়ে যায় একটি খবর: ভারতীয় সংসদে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলার প্রসঙ্গ উঠেছে। এই ব্যাপারটা সহজেই মনকে নাড়া দেয়। আর না দেয়ারই বা কি, যে দেশের সাথে আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সামাজিক বন্ধন অতি নিবিড়, সেই দেশটির রাজনীতিবিদেরা যদি আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, তবে সেটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন ভারতীয় সংসদে এই প্রসঙ্গ উঠে এলো?
গবেষণার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ৩১০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সত্যিই, এই সংখ্যা শোনার পর প্রথমে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আর পরিসংখ্যান যেদিন অনুভূতি জাগাতে শুরু করে, সেদিন থেকেই বোঝা যায় আমাদের সমাজের অধঃপতন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। ভারতীয় সংসদে এই প্রসঙ্গটি যখন তোলা হলো, তখন সেখানে পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে মানবিকতার প্রশ্নও ছিল। ভারতের সমাজেও সংখ্যালঘুরা সবসময় নিরাপদ নয়, তবুও এ ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে, কারণ মানবিকতা কখনোই সীমানা মেনে চলে না।
আমরা যদি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দিকে তাকাই, তবে দেখি যে এখানে বিভিন্ন সময়েই তাদের উপর নির্যাতন কিংবা বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যেই ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন, তারা অনেক সময় চাপে থেকে বা ভয়ে নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে সংকোচবোধ করে। এমনকি তাদের ধর্মীয় স্থানও হামলা থেকে রক্ষা পায় না। আর এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব, এবং কখনও কখনও রাজনৈতিক ফায়দা তোলার প্রয়াস।
ভারতীয় সংসদে এই প্রসঙ্গ উত্থাপিত হওয়ার পেছনে অবশ্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কিন্তু এর সাথে সাথে আমাদের জন্য এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই সমস্যার ব্যাপারে ধারনা পাচ্ছে। তারা হয়তো উদ্বিগ্নও হচ্ছে। এই উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতও। আর এ ব্যাপারে যদি ভারতের মতো বড় বাজার এবং প্রতিবেশী দেশ গুরুত্ব দেয়, তাহলে আমাদেরও নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করা উচিত।
অন্যদিকে, আমাদের সমাজের দিকে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখা যায় যে আমরা নিজেদেরকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে দাবী করে থাকি। কিন্তু বাস্তবতা কি? যখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কোনো অত্যাচারের ঘটনা ঘটে, তখন সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা কোথায় চলে যায়? আমাদের উচিত বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শুধু আইন করে সমস্যার সমাধান হবে না, তা বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারি? অবশ্যই পারি। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক জাগরণ এবং আমাদের মনে মানবিকতার পুনর্জাগরণ। আমরা যদি নিজেদের কর্ণপাত না করি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
আমাদের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংখ্যালঘু বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাদের শেখাতে হবে যে সব ধর্মই মূল্যবান আর সব ধর্মের অনুসারীরাই মানুষ হিসেবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য। পাড়ায় পাড়ায় অনুষ্ঠান আয়োজন করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তাতে সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী হবে আর ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ কমবে।
আমাদের দেশে আইন আছে, কিন্তু আইন কার্যকর করার ইচ্ছে এবং ক্ষমতা থাকলেই কেবল সেই আইন বাস্তবে ফলপ্রসু হবে। প্রশাসনকে আরও সাহসী হতে হবে এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকেও কঠোর হতে হবে যাতে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য এই ধরনের ঘটনা ঘটতে না পারে।
এই প্রসঙ্গে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছু করা উচিত। আমরা যদি প্রত্যেকেই একে অন্যের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাই, তবে হয়তো এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। আমাদের সত্যিই পুনরায় ভাবতে হবে যে, আমরা কি সত্যিকারের সমন্বিত এক জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারব?
শেষ কথা হিসেবে আমি এটুকু বলতে চাই যে, আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সম্ভব সহাবস্থান নিশ্চিত করা। ভারতীয় সংসদে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের প্রসঙ্গ উঠেছে এটা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। আমরা কি এই সতর্কবার্তাকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছি? নাকি শুধুই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি? সময় এসেছে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার। আজ যে শিশু সংখ্যালঘু হিসেবে বড় হচ্ছে, তার নিরাপত্তা এবং সুখী জীবন নিশ্চিত করার দায়িত্বটা কি আমরা নিচ্ছি? যদি না নিয়ে থাকি, তবে এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেয়ার।
