বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভান্ডার যদি কোথাও থাকে, তা হলে তা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। উঁচু পাহাড়, গভীর জঙ্গল এবং স্বচ্ছ নদীর স্রোত এই এলাকার প্রকৃতি যেন স্বর্গের মতো। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝে একটা দুঃখের কাহিনী গোপন হয়ে আছে, যা আমরা অনেকেই হয়তো জানি না বা জানলেও গুরুত্ব দেই না। সেটি হচ্ছে আদিবাসী ও পাহাড়ি খ্রিস্টানদের ডাবল-মার্জিনালাইজেশন, অর্থাৎ দ্বিগুণ প্রান্তিকীকরণ। ভূমি দখল এবং ধর্মীয় নিপীড়নের এক তিক্ত সত্য এখানে লুকিয়ে আছে যা আজকের এই লেখার মূল বিষয়।

বলুন তো, আপনার কি মনে আছে যখন আমরা ছোটবেলায় স্কুলে পড়তাম, পাহাড়িদের নিয়ে কত মজার মজার গল্প শুনতাম? তাদের সংস্কৃতি, তাদের জীবনের ভিন্নতার কথা। কিন্তু এই ভিন্নতার মাঝে যে একটা বেদনাদায়ক দিক আছে, সেটা আমরা কতটা বুঝি? ভূমি দখল হলো এক এমন সমস্যা, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জীবনকে এক ভয়াবহ দিক দিয়ে প্রভাবিত করে আসছে বহুদিন ধরে। যখনই কোনো প্রকল্প বা শিল্প প্রতিষ্ঠান সেখানে গড়ে উঠতে চায়, তখনই এই ভূমি দখলের সমস্যা সামনে চলে আসে। আদিবাসীদের মূল অধিকারকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ভূমি দখল। তাদের বসতভিটা, ফসলের জমি, এমনকি তাদের স্বপ্নগুলোও যেন কেড়ে নেওয়া হয়।

কিন্তু ভূমি দখলই তো সব নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধর্মীয় নিপীড়নের আরেক দিক। পাহাড়ি খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে যে নিপীড়ণের শিকার হয়, তা অনেকেই হয়তো জানেন না। ধর্মীয় অভিযানের নামে তাদের ওপর চলে নির্যাতন, কটূক্তি এবং সামাজিক অসহযোগিতা। যেন তাদের নিজ ধর্ম পালনের অধিকারটুকুও নেই। এই নিপীড়ন এমন এক স্তরে চলে গেছে যে, অনেক পাহাড়ি খ্রিস্টান বাধ্য হয়ে তাদের ঐতিহ্য আর বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে অন্য কোনো স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

এমন অবস্থায় জাতিগত ও ধর্মীয় প্রান্তিকীকরণকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হওয়া চরম দুর্ভাগ্যজনক। এখানকার মানুষরা যেন এক ডাবল-মার্জিনালাইজেশনের শিকার, যা তাদের জীবনকে এক প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। দুই পাশ থেকে চাপ আসছে একদিকে ভূমি দখল, অন্যদিকে ধর্মীয় নিপীড়ন। এই চাপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা কীভাবে টিকে থাকবে, এটা এক বড় প্রশ্ন।

ভূমি দখলের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, আদিবাসীদের ভূমি অধিকার আদায়ের জন্য সরকারের কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নেই। বরং যারা ভূমি দখল করে তাদের অনেক সময় শক্তিশালী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকে। এমন অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্তরা কোথায় যাবে? তাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই। তাদের ক্ষোভ, তাদের অভিযোগ, সবই যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়।

অন্যদিকে ধর্মীয় নিপীড়ন একটি সংবেদনশীল বিষয় হলেও, এ বিষয়ে বেশিরভাগ সময়ই মূলধারার মিডিয়া নীরব থাকে। ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পাহাড়ি খ্রিস্টানরা যে অসম আচরণের শিকার হন, তা কোনোভাবেই মানবাধিকারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু এমনকি মানবাধিকারের কথা বলেও কি কিছু হবে? যদি মানবতা নামক কোনো জিনিস থাকতো, তবে এসব ঘটনা ঘটতো না।

আমাদের দেশের প্রসিদ্ধ শিক্ষাবিদ প্রফেসর ইউনুস একবার বলেছিলেন, “আমরা যখন নিজেদের অধিকারের কথা বলি, তখন সেটিকে অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও বুঝতে হবে।” এই কথাটি সত্যিই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য। আমাদের উচিত তাদের সমস্যা বুঝতে চেষ্টা করা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি তা করছি?

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ও খ্রিস্টানদের এ ডাবল-মার্জিনালাইজেশন থেকে মুক্ত করা কি সত্যিই অসম্ভব? নাকি আমরা শুধু আমাদের ইচ্ছার অভাবে তা করতে পারছি না? এই প্রশ্নগুলো আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা যদি একটু সচেতন হই, একটু আন্তরিকতা দেখাই, তবে হয়তো এই সমাজে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

আমাদের উচিত হবে সবার আগে তাদের ভূমি অধিকারকে সুরক্ষিত করা এবং ধর্মীয় নিপীড়ন বন্ধ করতে সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানানো। তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের দায়িত্ব। এবং সেই সাথে আমাদের নিজেরাও সচেতন হওয়া উচিত যাতে আমরা কোনোভাবেই এমন কোনো অন্যায়ের অংশ না হই যা তাদের জীবনে আরও কষ্ট বাড়ায়।

আজকের এই চায়ে আড্ডায়, আমি আপনাদের সঙ্গে এসব কথা শেয়ার করলাম একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে। আপনি যদি মনে করেন এই সমস্যাগুলো শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের সমস্যা, তবে আপনি ভুল করবেন। এটা আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা, যা আমাদের সবাইকে একত্রিত হয়ে সমাধান করতে হবে। আপনার মতামত কি? আপনি কীভাবে ভাবছেন এই পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে? জানি না, আপনার চিন্তাভাবনা কী, তবে আশা করি আপনি আমার সঙ্গে একমত হবেন যে এই ডাবল-মার্জিনালাইজেশন বন্ধ করার জন্য আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। আপনারা কি বলেন?

By pritam