২০২২ সালটা কেমন শুরু হলো বলুন তো? আচ্ছা, আপনার কাছে হয়তো নতুন বছরের প্রথম দিনটা ছিলো উৎসবমুখর, পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে কাটানো আনন্দময় সময়ের একটি অধ্যায়। কিন্তু আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য এই বছরের সূচনা হয়তো পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। যখন মন্দির ভাঙা আর ঘর পোড়ার মতো ঘটনাগুলো খবরের শিরোনামে উঠে আসে, তখন বুঝতে পারি, এ দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য আশঙ্কার মেঘ কতটা গাঢ়।
এটা তো আমরা সবাই জানি যে, বাংলাদেশ হলো একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। তবে আমাদের গর্ব করার মতো একটি ঐতিহ্য আছে, যেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বাস করে। একে অপরের ধর্মকে শ্রদ্ধা করা এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা আমাদের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি, যেখানে এই সম্প্রীতি বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে।
কিছুদিন আগে একটা খবর দেখলাম। ছোট্ট একটা গ্রামে, যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি প্রাচীন মন্দির ছিলো, সেটাকে রাতারাতি ধ্বংস করা হয়েছে। কেন এমন হলো? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে একটু গভীরে যেতে হয়। সেখানকার মানুষ জানান, মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ এবং ক্ষমতাসীনদের প্রভাব খাটানোর ইচ্ছার কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। আর এই রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার হচ্ছে সেখানকার সংখ্যালঘুরা, যাদের মন্দিরের সাথে তাদের পরিবারের, তাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। রাতের আঁধারে মন্দির ভাঙা হয়, আর পরদিন সকালে যখন গ্রামের লোকজন এসে দাঁড়ায় সেই ধ্বংসাবশেষের সামনে, তখন তাদের মনে কেমন যন্ত্রণা হয়, তা আমরা কি কখনো বুঝতে পারি?
এই ধরনের ঘটনা শুধু একটি গ্রামের ব্যাপার নয়। এটা যেন একটা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেওয়া, তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা আগের বছরগুলোতেও আমরা দেখেছি, কিন্তু ২০২২ সাল শুরুতেই এমন ঘটনা ঘটলে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়ে যায়। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আসলেই সেই সম্প্রীতির দেশ, যেখানে সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে?
কিছুদিন আগেই আমি এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম, সে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি করে। তার কথায়, “আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে সম্প্রীতির উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা যখন ঘটে, তখন আমাদের মাথা নিচু হয়ে যায়।” সত্যিই তাই। আমি নিজেও বিদেশে গিয়ে অনেকবার গর্ব করে বলেছি যে, বাংলাদেশ হলো এমন একটি দেশ, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি যখন দেখি, তখন সেই গর্ব কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব? প্রথমত, আমাদের সবাইকে একসাথে দাঁড়াতে হবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন শুধু তাদের নিজস্ব ধর্মের মানুষ নয়, বরং সকল ধর্মের মানুষের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। মনে রাখতে হবে, অন্যায় যে কারও বিরুদ্ধে হোক, সেটা শেষমেশ আমরা সবাই আঘাতপ্রাপ্ত হবো।
দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণকারীদের দ্রুত বিচার করা এবং তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া জরুরি। প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে যে, তারা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আরও দ্রুত এবং কার্যকর হওয়া উচিত।
আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শেখানো অত্যন্ত জরুরি। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখানো উচিত অন্যের ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে সম্মান করা। আমরা যদি নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারি, তবে হয়তো ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কমে আসবে।
আমি আশা করি, ২০২২ সালটা আমাদের দেশের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ এবং সুখের সময় হবে। আমাদের উচিত, নিজেদের ছোটখাটো স্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশের এবং মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবা। আমরা সবাই মিলে যদি একসাথে দাঁড়াতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই এই অশনি সংকেতের কালো মেঘ কাটিয়ে উঠতে পারবো। কিন্তু সেই প্রশ্নটাই থেকে যায়, আমরা কি সত্যি সত্যি পরিবর্তন চাই? নাকি এই অশুভ চক্রের মধ্যেই ডুবে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি?
