ঢাকা শহরের বুকে যখন নতুন বছরের প্রথম আলো ফোঁটে, তখন আমরা সবার মতোই আশাবাদী হয়ে নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনার খোঁজে থাকি। কিন্তু এই আশার বাতাসে বিষের ছোঁয়া মেশে যখন সন্ত্রাসের খবর আমাদের কানে আসে। এই সন্ত্রাস শুধু রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ যেন আমাদের দেশজুড়ে এক অশুভ ছায়ার বিস্তার। নতুন বছরের শুরুতে, এমন এক উপহার আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য কী ধরণের বার্তা বহন করে, তা ভাবলে ভেতরটা কেমন যেন কুঁচকে যায়।

এই দেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু বলতে আমরা সাধারণত হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কথা বুঝি। সর্বদা আলোচিত, মানে বিশেষ সময়ে লক্ষ্যবস্তু করে তোলা এসব সম্প্রদায়ের প্রতি বছরের শুরুতেই এমন হামলা কি কোনো বার্তা বহন করে? নাকি এটি স্রেফ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাবের প্রমাণ মাত্র?

ঢাকার কথা বললে আমাদের মনে পড়ে উজ্বল আলো, এলোপাতাড়ি যানজট, আর হাজারো মানুষের কোলাহল। কিন্তু এই ব্যস্ত শহরেই যখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির, গির্জা বা বৌদ্ধ মঠে হামলা হয়, তখন আমাদের বিবেক প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়। কেনো এমনটি হচ্ছে? আমরা কি সত্যিই উন্নতির পথে এগোচ্ছি নাকি পিছিয়ে যাচ্ছি আদিম যুগের দিকে? যখন কোন বিশ্বাসের কারণে মানুষের উপর অত্যাচার করা হতো। ইতিহাস বলে, যে জাতি তার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে না, সে জাতি ভবিষ্যতে স্থিতিশীল হতে পারে না।

এখানে আরেকটা দিক আছে যা আমাদের ভাবায়। সেটা হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা। রাষ্ট্র কি করছে এইসব হামলা বন্ধ করতে? বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা আছে। তাহলে কেন এই ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতা বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী শুধুই চোখ বন্ধ করে থাকা নাকি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের পাওয়া দরকার, কারণ আমরা এভাবেই নিজস্ব সমাজকে আরও বেশি মানবিক ও সহনশীল করে তুলতে পারি।

এখন আমরা যদি একটু জেলায় জেলায় ঘুরে দেখি, আমরা কি দেখতে পাবো? সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের মুখে খুশির বদলে আতঙ্কের ছায়া। তাদের মনে ভয় কখন না জানি আবার হানাহানি শুরু হয়। তাদের উৎসবের দিনগুলোতে যখন আমরা আনন্দে মেতে থাকি, তখন তারা আতঙ্কে কাটায়। এই পরিস্থিতি কি পরিবর্তন করা সম্ভব না? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কি শুধুই কথায় থাকবে? ঢাকায় সন্ত্রাস এবং জেলায় জেলায় হামলা করে আমরা কি প্রমাণ করতে চাই? আমাদের সংস্কৃতি কি শেষ পর্যন্ত এমন একটি সমাজ তৈরির স্বপ্ন দেখায় যেখানে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে থাকতে পারে না?

আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মানুষের চিন্তাভাবনারও উন্নতি হওয়া উচিত। কিন্তু সত্যিকারের উন্নতি তখনই হবে যখন আমরা অন্যের ধর্মীয় অনুভূতি, বিশ্বাসকে সম্মান করতে শিখব। ধর্ম কারও দাবি নয়, এটি প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের উপর আঘাত করার অধিকার কারও নেই।

নতুন বছর মানে নতুন আশা, নতুন পরিকল্পনা। কিন্তু যখন আমরা এই বছরের শুরুতেই এমন একটি ঘটনা শুনি, আমাদের আশাগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? আমাদের নতুন প্রজন্মকে কি এমন একটি সমাজ উপহার দিতে চাই যেখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষ ভয়ে ভয়ে দিন কাটায়? আমাদের উচিত হবে সবাই মিলে এই বছরটিকে আরও ভালো করার চেষ্টা করা, যেখানে সন্ত্রাস ও বিদ্বেষের কোনো স্থান থাকবে না।

সত্যিকার অর্থে, আমরা যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে এমন দুর্ব্যবহার করি, তাহলে কীভাবে নিজেদেরকে উদার সমাজের নাগরিক বলে দাবি করব? আমাদের দায়িত্ব হবে এমন এক সমাজ গড়ে তোলা যেখানে সবাই নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এই নতুন বছর আমাদের সেই সুযোগ এনে দেবে, যদি আমরা নিজেরা ইচ্ছা করি। প্রশ্ন হলো আমরা সেই ইচ্ছা প্রকাশ করতে চাই কিনা? আমরা কি সত্যিই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নতুন বছরের উপহারকে প্রকৃতির আনন্দে রূপান্তরিত করতে পারব? সবার জন্য সুখ, শান্তি এবং সাম্যের সমাজ কি আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো থাকবে নাকি আমরা তা বাস্তবে পরিণত করতে পারব?

By arghya