গ্রামে মাইক, শহরে মিছিল: গুজবের আগুনে পুড়ছে সংখ্যালঘু ব্যবসা

বাংলাদেশের সমাজে গুজবের আগুনের তাপ নিয়ে আমরা অনেকেই চুপচাপ থাকি। কিন্তু এই আগুন যখন সংখ্যালঘুদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভসে পুড়ে দেয়, তখন আর চুপ থাকা সম্ভব হয় না। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সমাজ সহিষ্ণুতার কথা বলা হলেও মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের সেই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যখন বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করি, তখনও এই বিষয়টি বারবার আলোচনায় উঠে আসে। সংখ্যালঘুদের ক্ষতির হিসেব করতে গেলে গুজবের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু করি। আমার গ্রামের বাড়িতে কয়েক বছর আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল। এক সন্ধ্যায় গ্রামের মসজিদ থেকে মাইক দিয়ে ঘোষণা দেওয়া হলো যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ একজন কোরআন শরীফ অবমাননা করেছে। মাইক থেকে এমন ঘোষণা শোনার পর গ্রামের মানুষ উত্তেজিত হয়ে উঠলো। কতজন যে তৎক্ষণাৎ তাদের বাড়ির সামনে লোকজন জড়ো করেছিল, আর শুরু হলো তোপধ্বনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সংখ্যালঘু ব্যক্তির দোকানে হামলা হলো, দোকানের অধিকাংশ পণ্য ধ্বংস করে ফেলা হলো। পরে অবশ্য প্রমাণিত হয়েছিল যে ঐ গুজবটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং সেই নিরপরাধ ব্যক্তি কেবল গুজবের বলি হয়েছিলেন।

এই জাতীয় গুজবের ঘটনার সূত্রে মনে পড়ে শহরের কথা, যেখানে প্রতিবাদ বা মিছিলের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে যখনই এমন কোনো গুজব ছড়ায়, তখন তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি মিছিল বা প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়তো কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়, কিন্তু সেই গণমানুষের জটলা কখন ক্ষতির দিকে মোড় নেয় তা কেউ জানে না। সেই মিছিল থেকে নির্দিষ্ট করে কোনো সংখ্যালঘু ব্যবসা লক্ষ্যবস্তু হয়ে যায়। ছোটো ছোটো ব্যবসাগুলো এই গুজবের আগুনে পুড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই ব্যবসায়ীদের সম্পদ এবং জীবিকা।

গুজবের ‍উৎপত্তি কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ বিশেষভাবে লক্ষ্য করে। যখন কোনো গুজব ছড়ায়, তখন তার পেছনে বহু সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্যও গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়। সমাজের কিছু অসাধু ব্যক্তি এমন ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। আর সেই অরাজকতার মাঝেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীরা। তাদের পণ্য, সম্পত্তি বা কখনো কখনো তাদের জীবনও বিপন্ন হয়।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কম হলেও তাদের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। ব্যবসায়িক অঙ্গনে তারা প্রদীপ্ত ভূমিকা রাখছে। এরপরও এই সংখ্যালঘুদের নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় তাদের ব্যবসায়িক পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। সমাজে সচেতন মানুষরা যখন এই ব্যাপারে কথা বলেন, তখন কিছু মানুষ আবারও সেই একই দিকে ঝুঁকে পড়েন যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। গুজবের ভিত্তিহীনতা পরীক্ষায় না গিয়েই কিছু মানুষ তৎপর হয়ে ওঠে, যা ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

এই প্রবণতা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সমাজে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। প্রথমত, যেকোনো তথ্য শোনার পর তার সত্যতা যাচাই করা উচিত। তথ্য যাচাই না করলে আমরা খুব সহজেই গুজবের শিকার হতে পারি। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করলেও সেখানে সচেতনতা প্রয়োজন। ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা শুধুমাত্র ক্ষতির দিকেই নিয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, আমাদের প্রশাসনকেও আরও কঠোর হতে হবে। গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রশাসনের উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া উচিত। আমরা যদি এইসব উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি, তাহলে হয়তো একদিন আমাদের সমাজ একটি সহিষ্ণুতা ভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হবে। আমাদের উচিত এই সমস্যা সমাধানে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালানো।

তাহলে বন্ধুরা, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে এই কথা ভেবে দেখো, গুজবের আগুনে পুড়ে গেলে আমরা কী হারাই আর কী পাই। আজকের এই সমাজে, আমরা কি সত্যিই সহিষ্ণুতার পথে হাঁটছি, নাকি এই গুজবের আগুনে পুড়েই চলেছি? তোমার মতামত কী?