লোকজ সংস্কৃতিকে ‘কুফরি’ বলার রাজনীতি: সংখ্যালঘু শিল্পীদের ওপর চাপ

একবার ভাবুন তো, আমাদের দেশের সেই সব সমৃদ্ধ শিল্পীরা, যারা যুগ যুগ ধরে লোকজ গান, নৃত্য এবং নানা ধরণের শিল্পকর্ম লোকসমাজে ছড়িয়ে দিয়ে আসছেন, তাদেরকে হঠাৎ করে ‘কুফরি’ বা কাফের বলা হচ্ছে। কেমন লাগে শুনতে? লোকজ সংস্কৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যকে যদি কেউ অবজ্ঞা করে, তাকে ‘কুফরি’ বলে তিরস্কার করে, তাহলে সত্যিই হতবাক হতে হয়। এ যেন প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের সাংস্কৃতিক উগ্রবাদ যা আমাদের দেশের শিল্পীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে। এমনটাই ঘটছে আজকাল।

আমাদের দেশে লোকজ সংস্কৃতি একটি বিশাল ঐতিহ্য। এই সংস্কৃতি শুধু গান বা নৃত্য নয়, এটি আমাদের জীবনের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি ক্ষুদ্রাংশে মিশে আছে। এই সংস্কৃতি আমাদের গ্রামের মেলা, পুঁথিপাঠ, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, আর নানা রকম পুঁথি গানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যেটি এই সংস্কৃতিকে শুধু ছোট করে দেখাচ্ছে না, বরং তা বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রথমেই আসি সেই প্রসঙ্গে যেখানে লোকজ সংস্কৃতিকে ‘কুফরি’ বলা হচ্ছে। এদেশের কিছু মানুষ, যারা নিজেদের ধর্মীয় মতাদর্শের বাইরে কিছু ভাবতে চান না এবং তাদের মতে এর বাইরে যেকোনো কিছুই অবজ্ঞার যোগ্য, তারা এই সংস্কৃতিকে হেয় প্রতিপন্ন করে নিজেদের মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তারা সবসময় গায়ে একটি ধর্মীয় লেবেল সেঁটে দেয়। এই মধ্যযুগীয় মানসিকতা আজও দৃঢ়ভাবে টিকে আছে এবং তা লোকসংস্কৃতিকে হুমকিতে ফেলেছে। লোকজ সংস্কৃতি যে কেবলমাত্র এই ধর্মীয় উগ্রবাদীরাই আক্রমণ করছে তা নয়, অনেক সময় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চাপে পড়েও এটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বে এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

এখন কথা হলো, এই আক্রমণ মূলত কারা করছে এবং কেন করছে? লোকজ সংস্কৃতির আড়ালে যারা নিজেদের বিচিত্র জীবনযাপনের রঙিন চিত্র তুলে ধরছেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই সংখ্যালঘু শিল্পী। এই সংখ্যালঘু শিল্পীরা প্রায়শই ধর্মীয় এবং সামাজিক দিক থেকে অসম্পূর্ণতার শিকার হন। এদের মধ্যে অনেকেই মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বা অন্যান্য ধর্মের। কিন্তু এরা যখন লোকজ শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে চান, তখন তারা নানা রকম বাধার সম্মুখীন হন। এটা যেন একটা অদৃশ্য নিয়ম যে লোকজ শিল্প মানেই তা যেন ধর্মীয় দৃষ্টিতে অবমাননাকর!

এমনকি ধর্মীয় নেতাদেরও প্রায়ই দেখা যায় লোকজ সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে নানা রকম বিতর্কমূলক মন্তব্য করতে। তারা কখনো বলেন এসব গান নাচ মানে ‘বেদাত’ বা ধর্মীয় উচ্ছৃঙ্খলতা, কখনো বলেন এসব কাজ ‘কুফরি’ অর্থাৎ অমুসলিম কর্মকাণ্ড। এই ধরনের মন্তব্য শুধু যে শিল্পীদের মনোবল নষ্ট করছে তা নয়, বরং তাদের আত্মপ্রকাশের পথেও বাধা সৃষ্টি করছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক শিল্পী তাদের শিল্পকর্ম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের মনে একটা আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হচ্ছে এবং তারা ধীরে ধীরে সৃষ্টিশীলতাকে হারিয়ে ফেলছেন। এটা যেন একটা নিঃশব্দে মৃত্যুর মতো যা আমাদের দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করছে।

আরো একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, এইসব ‘কুফরি’ তকমা প্রদানকারীদের প্রভাব সমাজে এতটাই প্রবল যে, অনেক সময় সাধারণ মানুষও এসব বিশ্বাস করতে শুরু করে। ফলে সমাজে এমন একটা ভাব তৈরি হয় যে লোকজ সংস্কৃতি যেন ভুল এবং অবমাননাকর কিছু। কিন্তু এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণা কিভাবে আমাদের সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং আমরা কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পারি?

আমাদের উচিত অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং বর্তমানে আমাদের সংস্কৃতির মূল্যায়ন করা। লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে এবং এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ধর্মীয় নেতারা, সামাজিক নেতা এবং সংস্কৃতিপ্রেমী সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানো উচিত।

এ প্রসঙ্গে আমি একটা প্রশ্ন দিয়ে শেষ করতে চাই, আমরা কি একতাবদ্ধ হয়ে আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারি না? আমরা কি পারি না আমাদের শিল্পীদের সেই সৃজনশীলতাকে মুক্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে এবং সেই উত্তরই হবে আমাদের সংস্কৃতির মুক্তির পথ। আমি আপনাকে বলি, এটা আমাদের দেশের ঐতিহ্যের প্রশ্ন, আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তাই আসুন, আমরা একত্রে কাজ করি এবং আমাদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করি।

By nandini