মে মাসের গ্রীষ্মের জ্বলন্ত রোদে পথে নামার সময় আমরা যেমন ছাতা কিংবা টুপি নিয়ে প্রস্তুতি নিই, ঠিক তেমনিভাবে মানসিক প্রস্তুতিও নেওয়া উচিত কিছু অদৃশ্য কিন্তু তীক্ষ্ণ দেয়ালের সামনে। এমন এক দেয়াল, যা চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, তবুও তার উপস্থিতি অনুভব করা যায় প্রতিটি পদক্ষেপে। আজ কথা বলবো সেই দেয়ালগুলোর সম্পর্কে, যা আমাদের সমাজে ধর্মীয় ভেদাভেদ আর বিশ্বাসের পার্থক্য তৈরি করেছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় কমই। মানুষ ভাবে, এসব কথা বললে সমাজে অযথা বিতর্কের সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমরা যদি কথা না বলি, এই দেয়ালগুলো তো আর নিজে নিজে ভেঙে পড়বে না।

মন্দিরের সামনে বাধা দেওয়ার গল্পটা নতুন কিছু নয়। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নামে যে বৈষম্যের চর্চা আমরা করে যাচ্ছি, তা কখনো কখনো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আর মন্দিরের সামনে যখন কেউ ধরনের বাধা তৈরি করে, তখন বুঝতে হবে সেই দেয়াল কতটা শক্তিশালী। এই দেয়াল আমাদের সমাজে ধর্মীয় দুরত্ব বাড়িয়ে তোলে, আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূলে আঘাত হানে।

স্কুলের পরিবেশও রেহাই পায় না এই বৈষম্যের ছাপ থেকে। ‘কাফের’ বলার যে অভ্যাসটা আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি, তা শুধুই একটি ধর্মীয় অবজ্ঞা নয়, বরং এটি একটি সমাজের মানসিকতা প্রকাশ করে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা যখন ‘কাফের’ বলে গালাগালি করে, তখন সেটা শুধু একটি শব্দ হিসেবে নয়, বরং তাদের মধ্যে যে চিন্তা-ভাবনা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তার প্রতিফলন হিসেবে বেরিয়ে আসে। ছোটবেলা থেকে শুরু হওয়া এই বিভেদমূলক আচরণগুলো ক্রমশ কঠিন হয়ে যায়, যা পরবর্তী জীবনে বড় ধরনের সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে।

আমরা যারা বাংলাদেশে বসবাস করি, তাদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সহাবস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। আর এর মূল কারণ হলো ধর্মীয় ভেদাভেদ, যার ফলে প্রতিটি ধর্মের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস এবং বিরোধ বাড়ছে।

মে মাসে, যখন রোজার ঈদ উদযাপিত হয়, তখন এই অদৃশ্য দেয়ালের প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়। ঈদের সময় আমরা খেয়াল করি, একজন মুসলিম যখন তার হিন্দু সহকর্মীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানায়, তখন সেটা হয়তো আন্তরিকতা থেকেও হয়, কিন্তু অনেক সময়ই তার মধ্যে একটি ভিন্নধারার সংকেতও থেকে যায়। সেই সংকেতটা হলো, “তুমি ভিন্ন ধর্মের মানুষ, তাই তোমার জন্য আমার বিশেষ একটা শুভেচ্ছা।” এই সংকেত গুলোই আসলে অদৃশ্য দেয়ালের সিমেন্টের কাজ করে।

আমরা যদি সত্যিই এই দেয়াল ভাঙতে চাই, তবে আমাদের আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমেই আমাদের নিজেদের বিশ্বাস এবং ধ্যান-ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করতে হবে। আমাদের সমাজে যেসব ভ্রান্ত ধারণা এবং বিভেদমূলক আচরণ প্রচলিত আছে, তা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। শুধু মন্দিরের সামনে বাধা দিলে কিংবা স্কুলে কাউকে ‘কাফের’ বলে গালাগালি করলে কিছু লাভ হবে না। বরং আমাদের উচিত মানুষ হিসেবে একে অপরের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং তার অধিকার নিশ্চিত করা।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। স্কুলে শিশুদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং বৈচিত্র্যের গুরুত্ব শেখানো উচিত। পাশাপাশি পরিবারেও এই মূল্যবোধের চর্চা করতে হবে। পিতা-মাতা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা যখন দেখবেন, তাদের সন্তানদের মধ্যে কোনো ধরনের ধর্মীয় ভেদাভেদমূলক আচরণ প্রবেশ করছে, তখনই সেটা নিয়ে কথা বলা উচিত।

একটি সমাজ তখনই উন্নতি করতে পারে, যখন তার জনগণ পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সম্মানজনক আচরণ করে। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের নিজেদের ধর্ম ছাড়াও অন্য ধর্মের সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিই, তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করি, তবে সেই অদৃশ্য দেয়াল ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়বে।

অবশেষে, আমাদের সমাজের সেই অদৃশ্য দেয়ালগুলো কি একদিন পুরোপুরি বিলীন হবে? আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজে বাস করতে পারবো, যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ থাকবে না এবং সবাই একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো আমাদের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে। তবে আশা করা যায়, যদি আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি, তাহলে হয়তো একদিন সেই দেয়ালগুলো ভেঙে পড়বে এবং আমরা একটা সুন্দর, সহিষ্ণু সমাজ গড়তে পারবো।