কলকাতা, ত্রিপুরা ও আসাম এই তিনটি অঞ্চলের নাম শুনলেই অনেকের মনে যে ভয়ঙ্কর শব্দটি জেগে ওঠে তা হলো ‘অবৈধ বাংলাদেশি’। বাংলাদেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এ অঞ্চলে বসবাস করা মানুষেরা তাদের পরিচয় নিয়ে প্রতিনিয়ত টানাপড়েনির মধ্যে থাকে। তারা যেন কেবলমাত্র পরিচয় সংকটের ভারে নুয়ে পড়া কিছু মানুষ, যাদের জীবন সারাক্ষণ দোলাচলে কাটে। আর এ জীবনযুদ্ধের সাক্ষী বলতে গেলে আমি নিজে, কারণ আমার নিজের চাচাতো ভাইও এমন একটি পরিস্থিতির শিকার।

কলকাতা বাংলাদেশের সাথে আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন রয়েছে। এই শহরেই বহু বাংলাদেশি তাদের জীবনের কিছু সময় কাটাতে এসেছে, কেউ কেউ কাজের সন্ধানে, কেউ শিক্ষার জন্য, এবং কেউ শুধুমাত্র পরিবার পরিজনের সাথে থাকার ইচ্ছে পোষণ করে। কিন্তু এই সহজ সরল ইচ্ছের কারণে তাদেরকে যে কীভালো ভোগান্তির শিকার হতে হয় তা, হয়তো, কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে। অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত হবার আতঙ্কে দিনকাল কাটানো, সামাজিকভাবে অপমান সহ্য করা এবং নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হওয়া যেন তাদের নিয়তি।

ত্রিপুরার কথা বললে, এটি ভারতের সেই অংশ যেখানে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষজন অনেকেই বসবাস করে। এই ত্রিপুরা রাজ্যে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হলে জীবনটা যেন এক নিষ্ঠুর কারাগারে পরিণত হয়। আমার বিবাহিত এক কাজিন ত্রিপুরায় থাকেন এবং তার কাছে শুনেছি কিভাবে তার আশেপাশের মানুষজন এই তকমা নিয়ে ভয়াবহ মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটায়। প্রশাসনিক ঝুটঝামেলা, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়া তাদের নিত্যদিনের ঘটনা। এ যেন এক অবিরাম চক্র, যার থেকে মুক্তির স্বপ্ন কেবল স্বপ্নেই থেকে যায়।

আসামের পরিস্থিতি আরও কিছুটা জটিল। এখানে জাতিগত এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার সাথে মিশে যায় বাংলাদেশি হওয়ার তকমা। নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি তালিকায় নাম না থাকলে জীবন হয়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। আমার এক বন্ধুর পরিবারের সদস্যদেরও এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। বিনা নোটিশে এনআরসি অফিস থেকে ডাকা হয়েছিলো তাদের। পুরো পরিবারটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলো আতঙ্ক এবং তারা চিন্তা করেছিলো এ যাত্রায় কি আদৌ বাঁচা সম্ভব হবে।

এই তিনটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের গল্প শুনে মনে হয়, পরিচয়ের সংকট তাদের শুধু সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করছে না, বরং এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিভেদও তৈরি করছে। তারা নিজেদেরকে কোথাও পুরোপুরি স্বস্তিতে রাখতে পারে না। বাংলাদেশে ফিরে গেলে তারা অনেক সময় সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশের সম্মুখীন হয় এবং সেই পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় নতুন করে সংগ্রাম করতে হয়।

এভাবে জীবন কাটানোর মানে কী? কেন এই মানুষগুলোকে অবৈধ হিসেবে তকমা দিয়ে বেঁচে থাকতে হয়? এখানে প্রশ্ন জাগে, এই অভিবাসনের প্রেক্ষাপটে কি আমাদের রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব নেই? আমাদের কি উচিত নয়, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে, তাদের মানবাধিকারের প্রতি নজর দেওয়া? আবার এ নিয়েও তো ভাবতে হয়, কেন এই মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক বিপন্ন জীবনে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হচ্ছে? এর পেছনের কারণগুলো চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, চাকরি ও জীবিকার সংকট, শিক্ষা ও উন্নতির সুযোগের অভাব এবং পারিবারিক সংযোগের অভিলাষ তাদেরকে এই ঝুঁকি নিতে উদ্বুদ্ধ করছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারতীয় গণমাধ্যমে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ তকমাটি নিয়ে যে ধরনের সংবাদের সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় সত্যিকারের পরিস্থিতির সাথে মেলানো যায় না। এটি কেবলমাত্র বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ককেও বিপন্ন করে তোলে না, বরং জনমনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। সময় এসেছে, এই সমস্যার সমাধানে যৌথভাবে কাজ করার, যাতে করে কোনো নির্দোষ মানুষকে তার জন্মভূমির জন্য শাস্তি পেতে না হয়।

এই অবৈধ বাংলাদেশিরা আসলে নন, তারা আমাদের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। আমরা যদি তাদের সুযোগ দেই, তবে তারা আমাদের সমাজের সম্পদে পরিণত হতে পারে। শেষমেশ প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি অন্য দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য একই সহযোগিতা করতে পারি না, যেমন তারা আমাদের দেশের নাগরিকদের জন্য করে থাকে? আমাদের মানবিক মনোভাব কি সেই পর্যায়ে এখনো পৌঁছায়নি যেখানে জাতি, ধর্ম, এবং ভাষা ভেদাভেদ ভুলে শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারি?

By mousumi