শিরোনামটিই বলে দেয়, ‘মন্দিরের আঙিনায় অস্থায়ী শরণার্থী শিবির: ভেতরে কান্না, বাইরে রাজনীতি’। এই শব্দগুলোর মধ্যে এমন এক সত্য গাঁথা রয়েছে যা আমাদের মানবতার কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। আমি আজ এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই, কারণ এই পরিস্থিতি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা একবার ভেবে দেখা উচিত।

আমাদের দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সময় সময় বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত থাকে। আমরা জানি, এই এলাকাগুলোতে সাম্প্রদায়িক হানাহানি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিভিন্ন সময়েই দেখা যায়। এমনই এক সংকটময় সময়ে, যখন মানুষের বাড়ি-ঘর পোড়ানো হয়, তাদের আশ্রয় মেলে মন্দিরের আঙিনায়। উপাসনার স্থান তখন পরিণত হয় অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে। মন্দির, যা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চর্চার স্থান হিসাবে পরিচিত, তখন হয়ে ওঠে কান্নার কোলাহলে ভরা একটি শিবির।

আমার মনে আছে, কয়েক বছর আগে আমার গ্রামের আশপাশের এলাকায় এমনই এক সংকটময় পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। তখন মন্দিরে আশ্রিত বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে ছিল শিশু, বৃদ্ধ, নারী সমাজের সব অংশের মানুষ। তাদের চোখে ছিল ভয়, চেহারায় ক্লান্তি। খাবার, নিরাপত্তা সবকিছুর অভাব তাদেরকে যেন ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে দিচ্ছিল। কিন্তু এই কান্না, এই দুঃখ আমাদের কিছু শেখাতে চায়। এই অস্থিরতার মধ্যে আমরা তাদের জন্য কী করতে পারি?

এই তর্কবিতর্কের মধ্যে একটি বিষয় কিন্তু কখনোই হাতছাড়া করা উচিত নয় এইসব অস্থায়ী শিবিরের বাইরে যে রাজনৈতিক খেলা চলে, তা ভীষণভাবে নিন্দনীয়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময়ই এই সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তারা শরণার্থীদের দুরবস্থা নিয়ে রাজনীতি করে, নিজেদের ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। এমনকি মন্দিরের মতো পবিত্র স্থানও তারা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে কুণ্ঠিত হয় না। এটা কি আদৌ কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

বাংলাদেশে আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য গর্ব করি। কিন্তু যখন এই সম্প্রীতি ভেঙে যায়, তখন আমাদের কী কর্তব্য? কেবল রাজনৈতিক নেতাদের দোষারোপ করলেই হবে না। আমাদের নিজেদের মধ্যে একতা, সচেতনতা এবং সহানুভূতির অভাব কোথায় তা খুঁজে বের করতে হবে। আমরা কি পারি না এক হয়ে, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে এই দুর্যোগে একে অপরকে সহায়তা করতে?

আমার মনে পড়ে সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা, যে তখন মন্দিরের বারান্দায় বসে তার মায়ের কোলে নিশ্চুপ ছিল। তার চোখে ছিল এক ধরনের অনিশ্চয়তা, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের সংশয়। সে জানে না যে পরের দিন তার খাবার জুটবে কিনা, তার বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা। আমার মনে হয়, আমরা সবাই তার জন্য কিছু করতে পারি। এই অস্থায়ী শিবিরগুলো কেবল কান্নার স্থান হয়ে থাকবে না, বরং আমরা চাইলে এগুলোতে সহানুভূতি, আশা এবং মানবতার গল্প তৈরি করতে পারি।

তবে একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই সমস্যার মূল কারণ কিন্তু শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিকও বটে। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আমাদের রাজনীতির মানচিত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনীতিবিদদের উচিত হবে এই সংকটকে কেবল ফায়দা লোটার মাধ্যমে না দেখে, বরং আন্তরিকভাবে সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা। আমরা চাইবো তারা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াবে, তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করবে। এই সংকটের সময় রাজনৈতিক দলগুলো যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে হয়তো এর সমাধান সহজ হতে পারে।

আমি বুঝতে পারি, এই গল্পগুলো শুনতে অনেক ভয়ঙ্কর লাগে। কিন্তু এগুলো আমাদের বাস্তবতা, আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে এই সমস্যাগুলোকে আমাদের গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। মন্দিরের আঙিনায় যেন আর নতুন কোনো কান্নার শব্দ শোনা না যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আমরা কি একসঙ্গে কাজ করতে পারি না, সেই ছোট্ট মেয়েটির মুখে হাসি ফোটানোর জন্য? আমরা কি পারি না আমাদের মানবতার ছায়া একটু বাড়িয়ে একটি ভালো পৃথিবী গড়ে তুলতে? গভীরতর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আজ আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। কেননা এই অস্থায়ী শিবিরের কান্নার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে একটি সুন্দর আগামী গড়ার সম্ভাবনা। আমরা সেই সামর্থ্য রাখি। আসুন, সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করি।