নতুন বছরের শুরুতেই এমন কিছু খবর পেয়ে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আমাদের দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন বা তাদের স্থাপনাগুলো ধ্বংসের ঘটনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু ২০২৩-এর শুরুতেই এমন কিছু ঘটবে তা যেন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের সমাজে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের মুখ কালো করে দেয়। মন্দির ভাঙা ও ঘর পোড়ানোর ঘটনা যেন সেই পুরনো ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি। অনেকে হয়তো বলবেন এ তো নতুন কিছু নয়, কিন্তু সত্যি বলতে, এই ব্যাপারগুলো মনকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।
২০২২ সালের শেষের দিকে আমরা যে সমস্ত সহিংস ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম, তার ধাক্কা এখনও কাটেনি। আলোর উৎসব পেরিয়ে নতুন বছরে পা দিয়েছি, ভেবেছি এবার হয়তো কিছুটা শান্তি পাবো। কিন্তু জানুয়ারি মাসের শুরুতেই আবার সেই শিরোনামে দেখা গেল, কোনো এক গ্রামে মন্দির ভাঙা হয়েছে, ঘরবাড়ি পুড়েছে। খবরটা আসলে আমাদের মুখে চপেটাঘাতের মতো। নিন্দা শুধু বলার জন্য বলা, যদি আমরা এক্ষেত্রে কিছুই করতে না পারি, তাহলে তো এই নিন্দার কোনো মূল্য নেই।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? কেন আমরা এই ধরনের বর্বরতার শিকার হচ্ছি? কোনো এক বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীকে টার্গেট করা আসলে কিসের ইঙ্গিত দেয়? আমার মনে হয়, এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সামাজিক বৈষম্য। যে কোনো অজুহাতে সাম্প্রদায়িক সংঘাত তৈরি করা আমাদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য।
আমাদের দেশের ঐতিহ্য তো বলা হয় সহনশীলতার। একে অপরের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান ও সন্মান করার শিক্ষা আমরা পাই আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। তাহলে এই সহিংসতা কোথা থেকে আসে? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, এমনকি পরিবারেও কি কোথাও আমরা ভুল করছি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।
যখনই আমি এসব কথা ভাবি, তখন আমার মনে পড়ে যায় আমার শিক্ষাজীবনের দিনগুলোর কথা। একবার আমাদের স্কুলে একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম, সেখানে বিভিন্ন ধর্মের পড়ুয়ারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছিলাম। তখন কেউ কারো ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি, বরং সবাই একসাথে মিলেমিশে অনুষ্ঠান করেছিলাম। কিন্তু এখন কেন এই বিভাজন?
সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যখন এসব ঘটনার সংবাদ দেখি, তখন অনেকেই হয়তো ভেবে বসেন, এসব তো শুধু সংখ্যালঘুদের সমস্যা। কিন্তু সত্য হলো, এটি সবার সমস্যা। কারণ একটি সমাজে যখন কোনো একটি গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ করা হয়, তখন সেটা পুরো সমাজের জন্যই হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা কি পারি না একবার ভাবতে, কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়? আমাদের খুব বেশি প্রয়োজন সবধরনের ভেদাভেদের উর্ধ্বে উঠে একসাথে কাজ করা। আর সেটা শুরু করতে হবে আমাদের পরিবার থেকে। শিশুদের শিখান যে, ধর্মীয় ভিন্নতা কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করে।
রাজনৈতিক নেতাদেরও এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। কারণ রাজনীতি দ্বারা আমরা অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। কিন্তু যখন রাজনীতিই বিভাজনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটা অনুচিত। আমাদের উচিত হবে এমন সমাজ গড়ে তোলা যেখানে সবাই একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারে।
যে কোনো ঘটনা ঘটার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোর সমাধান করাটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিয়েই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, বরং আমাদের দরকার এই ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সেই ব্যবস্থা করা। আমরা যদি সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করি, তাহলে হয়তো একদিন আমরা এমন এক পৃথিবী পাবো যেখানে মানুষ মানুষের জন্য ভালোবাসা দেখাবে, অন্যায়ের বিচার হবে সঠিকভাবে এবং মন্দির ভাঙানো বা ঘর পোড়ানোর মতো ঘটনা আর ঘটবে না।
এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কি ভাবছেন? আমরা কি এই সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো? ভবিষ্যতে কেমন সমাজ গড়ে তুলতে চাই আমরা? আপনার মতামত কি?
