শিরোনামটা দেখে এক ঝটকায় কৌতূহল জাগলো। “একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে শুরু: ফেব্রুয়ারিতে ধারাবাহিক গুজব-নির্ভর সহিংসতা” এমন শিরোনাম তো আর সহজে দেখা যায় না। এত কিছুর মধ্যে কেমন করে একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে সহিংসতা শুরু হতে পারে, এটা ভাবতেও অবাক লাগে। কিন্তু সত্যি বলতে আমাদের সমাজে এমন ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটে। ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়ানো যেন নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদের জীবনে আকাশপাতাল প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এর সাথে সাথে অনেক সমস্যার সূত্রপাতও হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো গুজব ছড়ানোর প্রবণতা। আমাদের সমাজের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো এমন যে, একবার কোনো কিছু শুনলে সেটা যাচাই না করেই বিশ্বাস করার প্রবণতা কাজ করে। এগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো কিছু অতিরঞ্জিত ভাবে উপস্থাপন করে সহিংসতা বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যেন সহজ হয়ে গেছে। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে এবং ঘন ঘন অশান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে, খুব সম্ভবত ২০২৩ সালেই, একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে কেমন করে একটা পুরো এলাকা উত্তাল হয়ে উঠল। একটি সামান্য পোস্টে লেখা হয়েছিল যে, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় নাকি অন্য কোনও সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। কিন্তু সত্যি বলতে, ওই পোস্টের কোনো ভিত্তি ছিল না। কেউ যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি তৎক্ষণাৎ সমস্ত মানুষ সেই পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে সেই পোস্ট ভাইরাল হয়ে গেল।
যারা পোস্টটি শেয়ার করছিল, তারা হয়তো ভাবছে, “আমি তো শুধু শেয়ার করছি, এতে কি এমন ক্ষতি হবে?” কিন্তু এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই গুজব পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল, এবং তাতে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করল। আমি নিজে সেই সময়ে ওই এলাকার একজন বাসিন্দা ছিলাম, এবং নিজের চোখে দেখেছি কিভাবে অশান্তি শুরু হয়েছিল।
মনে আছে, পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রচুর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ক্ষতি তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেকেরই বাড়িঘর ভাঙচুর হলো, নিরীহ মানুষ আহত হলো। কেউ কেউ আবার এর সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর চেষ্টা করল।
এই ঘটনা আমাদের একটা বড়ো শিক্ষা দেয় ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে আমরা যা কিছু দেখি, তা যাচাই করে দেখা আমাদের কতটা প্রয়োজন। আমরা কেবলমাত্র একটি পোস্ট শেয়ার করছি বলে মনে হলেও, তা আমাদের সমাজে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, তা ভাবনার বাইরে থাকে।
দেশে শিক্ষা এবং সচেতনতার অভাব একটি বড়ো সমস্যা। আমি মনে করি, এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল সচেতনতার প্রচার করা অত্যন্ত জরুরি। স্কুল-কলেজগুলোতে সেই শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা বুঝবে কিভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয় এবং কোন ধরনের তথ্যে বিশ্বাস করা উচিত।
আমাদের সবারই উচিত একটু দায়িত্বশীল হওয়া। ইন্টারনেটের যুগে আমরা সবাই সাংবাদিকের ভূমিকা পালন করছি। যদি আমরা গুজব ছড়াতে শুরু করি, তবে তার পরিণাম হতে পারে ভয়ঙ্কর। ফেসবুক বা অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে ভুলভাবে ব্যবহার না করে, আমরা এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভালো কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারি।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই শিক্ষাটি গ্রহণ করব? আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিষয়ে সচেতন করব? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদের হাতেই রয়েছে। আমরা যদি সচেতন হই, তবে হয়তো একদিন এই প্রযুক্তির যুগে আমাদের সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। কিন্তু তার জন্য আমাদের চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সচেতনতাই পারে এই গুজব নির্ভর সহিংসতা বন্ধ করতে। আশা করি, আমরা সেই বাস্তবতার দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারব।
