বন্ধুরা, আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু বেশ সংবেদনশীল এবং জরুরি। আমরা অনেক সময় দেখেছি, সমাজের নানা স্তরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করা হয়। বিশেষ করে, স্কুল-কলেজে সংখ্যালঘু ছাত্রদের অপমান ও বিভিন্নভাবে হয়রানির কথা শোনা যায়। আমি জানি না আপনারা কেউ এরকম কিছু দেখেছেন কিনা, কিন্তু আমি অনেক সাক্ষী। আর এখন এই অপমানের নতুন মঞ্চ হয়ে উঠেছে আমাদের প্রিয় ডিজিটাল দুনিয়া টিকটক, লাইভ ভিডিও, যেখানে লাইভ-হ্যারাসমেন্ট চলছে অবাধে।

আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, যেখানে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি নিই, সেখানেই যদি আমরা ভেদাভেদ, অপমান আর অবিচারের শিকার হই, তাহলে কীভাবে একটি স্বাস্থ্যকর সমাজ গড়ে উঠবে? একটা ঘটনাই বলি, যা আমি নিজ চোখে দেখেছি। আমার ছোটবেলার বন্ধু জয়ন্ত, যার ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু, তাকে স্কুল জীবনে প্রায়ই নানা ধরণের কটূক্তি শুনতে হত। ক্লাসে শিক্ষকদের সামনেও এমন কিছু কথা বলা হতো, যা সত্যিই বেদনাদায়ক। জয়ের মত অনেকেই হয়তো প্রতিবাদ করতে পারে না, কিন্তু তার মনোভাব কেমন হতে পারে, ভাবুন একবার।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়, এটা একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে আমাদের মূল্যবোধ, সমতা আর সহমর্মিতা শেখানো উচিত। কিন্তু এখানে যদি অন্য ধর্ম বা সংস্কৃতির মানুষদের অবজ্ঞা করা হয়, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসল উদ্দেশ্য কি ব্যর্থ হচ্ছে না?

এবার আসি অনলাইন জগতের প্রসঙ্গে। টিকটক আর ফেসবুক লাইভের যুগে আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে আমরা সহজেই কোনো কিছু শেয়ার করতে পারি, কিন্তু সেই সাথে ভুল তথ্য বা নেতিবাচক অবস্থানও সহজেই ছড়িয়ে দিতে পারি। টিকটকে লাইভ হ্যারাসমেন্টের ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। একটা উদাহরণ দিই, বেশ কিছুদিন আগে এক হিন্দু স্কুলছাত্রকে তার ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে অপমান করা হয় একটি লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে। এত সহজেই আমরা অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারি! এটা কি আমাদের নৈতিকতার দেউলিয়াপনা নয়?

অবশ্যই, আমাদের সমাজে এমন মানুষের অভাব নেই যারা এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কিন্তু তাদের সংখ্যা এতই নগণ্য যে তাদের কণ্ঠস্বর প্রায়ই চাপা পড়ে যায়। আমাদের উচিত এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, একে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করা।

আমাকে একটা কথা বলতেই হবে, আমরা যে বাংলাদেশের নাগরিক, সেই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গঠিত, যেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমান অধিকার থাকবে। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এই দেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য দূর করার জন্য। সেই দেশেই আজ সংখ্যালঘু ছাত্ররা যদি অপমানের শিকার হয়, তাহলে তার দায়ভার কার?

আমরা যদি আমাদের সন্তানদের এমন একটি সমাজে বড় হতে দিই যেখানে তারা নিজেদের পরিচয়ে গর্বিত হতে পারে না, তাহলে আমরা আসলে মানুষ গড়ছি না, বরং একটা সংকীর্ণ মানসিকতার প্রজন্ম তৈরি করে যাচ্ছি। এটা কি আমরা চাই? অবশ্যই না।

আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিলেই হবে না, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেও ভ্রাতৃত্বের বোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকগণকে এই বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। আর অনলাইনে যে শিষ্টাচারবোধ এবং সম্মানবোধ থাকা উচিত, সেটাও আমাদের শেখাতে হবে ছোট থেকেই।

আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কী করছি? আমরা কি শুধুই দর্শক হয়ে থাকব, নাকি এই সমস্যার সমাধানে হাত বাড়াব? আমরা কি এই সমাজকে আরও বিভক্ত করব, নাকি সবাই মিলে এক হয়ে এক নতুন বাংলাদেশ গড়ব?

আজকের লেখাটা আমি এই প্রশ্নগুলোই রেখে শেষ করতে চাই। আমি জানি, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়, তবে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, আমরা সবাই মিলে একসাথে না দাঁড়ালে এই অন্যায় আর অপমান কখনও বন্ধ হবে না।