মোবাইল কোর্ট, ভ্রাম্যমাণ অভিযান: সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের ওপর ‘নির্বাচিত’ চাপ
বেশ কয়েকদিন ধরেই আমি একটা বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত। একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে একদিন যখন শুনলাম মোবাইল কোর্ট আর ভ্রাম্যমাণ অভিযানের কথা, তখন থেকেই বিষয়টা নিয়ে ভাবছি। আমরা বাংলাদেশের মানুষ, আমাদের মনোভাবই তো এমন যে যেটা চোখের সামনে ঘটছে সেটা নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাই না। কিন্তু যখন থেকেই শুনলাম সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের উপর ‘নির্বাচিত’ চাপের কথা, তখন মনে হলো কানে তুলো দিয়ে থাকাটা মোটেই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। চলুন, সামান্য একটা চায়ের কাপে বসে চিন্তা করি, এ ঘটনা গুলো আসলে কী।
প্রথমেই আসি মোবাইল কোর্ট আর ভ্রাম্যমাণ অভিযানের কথায়। মোবাইল কোর্টের ধারণা তো আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়, কিন্তু এই কোর্টের লক্ষ্যবস্তু যখন কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হয়ে যায়, তখন তা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ভ্রাম্যমাণ অভিযান বলতে আমরা বুঝি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রের অভিযান, যা হঠাৎ করেই নির্দিষ্ট স্থানে চলে যায় এবং সেখানে আইনভঙ্গ বা অন্য কোনো সমস্যার সমাধান করা হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে এই অভিযানগুলোতে কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে টার্গেট করা হচ্ছে, যাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।
এই অভিযোগের পেছনে একটা বাস্তবতা আছে, সেটা না বললে ভুল হবে। আমাদের দেশে সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীরা অনেকক্ষণ ধরে অবহেলিত এবং নিগৃহীত হয়ে আছেন। তাদের ব্যবসায় চালিয়ে যাওয়ার পথে নানা ধরনের বাধা এসেছে, সেটা সামাজিক হোক বা রাজনৈতিক। কিন্তু যখন এই ভ্রাম্যমাণ অভিযান গুলো তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করছে, তখন তা সত্যিই একটা গভীর সংকটের সৃষ্টি করছে।
আমাদের দেশে ব্যবসা শুরু করা মানেই একটা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। তার উপর যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ হন, তাহলে সেই চ্যালেঞ্জ দ্বিগুণ হয়ে যায়। আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অন্যায় ভাবে হয়রানি করার বহু নজির রয়েছে। মোবাইল কোর্টের এই অভিযানগুলোর মাধ্যমে যদি সেই হয়রানি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে ব্যবসার পরিবেশ কীভাবে ভালো হবে?
যদিও রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তা যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা কখনোই ন্যায্য হতে পারে না। এই অভিযানগুলো অবশ্যই হতে হবে নিরপেক্ষ এবং সকলের জন্য সমান। মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম এমন হওয়া উচিত যে তা শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। ব্যবসায়ীদের যদি অসাধু পন্থায় নিগৃহীত হতে হয়, তাহলে সেই ব্যবসায়ীরা কীভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে?
একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধরুন, একটা পাবলিক টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইল কোর্টের অভিযান চালানো হচ্ছে। বেশিরভাগ সময়ে এই অভিযান গুলো পরিচালিত হয় শহরের ব্যস্ততম এলাকায়, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যবসা চালান। কিন্তু যদি লক্ষ্য থাকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, তাহলে সেই অভিযান কতটা যুক্তিযুক্ত?
তাহলে প্রশ্নটা হলো, সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের ওপর এই ‘নির্বাচিত’ চাপ আসলেই কীভাবে সমাধান করা যায়? আমি বিশ্বাস করি, এই সমস্যার সমাধান আমাদের হাতেই আছে। প্রথমত, প্রতিটি অভিযানে কি হচ্ছে এবং কাকে টার্গেট করা হচ্ছে তা গুরুত্বের সাথে প্রমাণাদিসহ পর্যবেক্ষণ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীদের জন্য একটি স্বাধীন কমিটি কার্যকর করা উচিত, যা তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে এবং কোনো ধরনের হয়রানি হলে তা তদন্ত করবে।
তৃতীয়ত, আমাদের সমাজকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। প্রতিটি মানুষেরই অধিকার আছে সমানভাবে ব্যবসা করার এবং তা সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার। আমাদের উচিত হবে এই অভিযান গুলো যাতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উপর কেন্দ্রীভূত না হয়, তা নজরদারি করা। আর সবশেষে, রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং আমাদের ব্যবসায়ীদের নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার, সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের ওপর এই চাপ কি শুধুই ব্যবসার ক্ষতি করছে নাকি আমাদের সমাজের সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্যকেও হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে? আমাদের উচিত হবে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং তা নিরপেক্ষভাবে সমাধান করা। রাজনীতির ফাঁদে পড়ে আমাদের ব্যবসায়ীরা যাতে নিগৃহীত না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের উচিত হবে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। পাঠক, আপনার মতামত কী?
