আপনি কি কখনো এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন যেখানে ন্যায়বিচার চাওয়ার গন্তব্যটি নিজেই ভয়াবহতার হুমকিতে পরিণত হয়? যাদের ঘরে আগুন লেগেছে তারাই পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ করার জন্য গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখান থেকেই খালি হাতে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। এটি কেবল কল্পনার কোনো ঘটনা নয়, বরং আমাদের এই বাংলাদেশে আমরা এমন পরিস্থিতির সাথে পরিচিত যা অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

আমরা যখন ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটা বলি, তখন আমাদের সামনে ভেসে ওঠে সেই মানুষগুলোর মুখ যারা ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা সামাজিকভাবে সংখ্যায় কম এবং অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তারা অনেক সময় পরিস্থিতির শিকার হন যা তাদের আরও গভীর বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়। এমনই এক পরিস্থিতি হল থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে ফিরে আসা। এই ব্যাপারটা আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, যিনি নিজে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

একদিন সন্ধ্যায় আমরা কয়েক বন্ধুরা একসাথে বসেছিলাম, হাতে চায়ের কাপ আর মন ভরা একরাশ কথা। তখনই সে জানালো তার গ্রামের এক ছোট্ট ঘটনার কথা, যা হয়ত পত্রিকার পাতায় কখনো আসেনি। তার গ্রামের এক সংখ্যালঘু পরিবার কিছু স্থানীয় দুষ্কৃতিকারীদের দ্বারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল। তাদের জমি দখল করার চেষ্টা, বাড়ির সামনে এসে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ – এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছিল। তারা একদিন সাহস করে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছিল। কিন্তু অভিযোগ নেওয়া তো দূরের কথা, তাদেরকেই উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হলো। “অভিযোগ তুলতে গেলে বিপদ বাড়বে” – এমনটাই শুনতে হলো তাদের।

আমার সেই বন্ধুর কথা শুনে ভাবছিলাম, এটা কেমন ধরনের সমাজ যেখানে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোও যেন এক দুঃসাহসিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ যে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবে, তাদের নিরাপত্তা দিবে, সেই আশাই যেন ভেঙে গিয়েছে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি অত্যাচারের ঘটনা নতুন কিছু নয়। সংখ্যার বিচারে তারা কম হলেও তাদের মানবাধিকার আর নিরাপত্তার কোনোরকম ঘাটতি হওয়া উচিত নয়। তবে বাস্তবতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিন্ন। তাদের অনেকেই নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন, কিন্তু তার বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, অভিযোগ করার সাহস করতেও হিমশিম খেতে হয়।

অবশ্য এ কথা ঠিক যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিছু কিছু এলাকায় প্রশাসন আন্তরিকভাবে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য কাজ করছে। কিন্তু এখনও এমন অনেক স্থান রয়েছে যেখানে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যাগুলো মারাত্মক রূপ ধারণ করে, যেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দাপট বেশি। তারা প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়, ফলে সংখ্যালঘুরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পুলিশের অনেক সদস্য সত্যিই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের হাত-পা যেন বাঁধা থাকে কিছু প্রভাবশালী মহল দ্বারা। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কী করবে? তারা কোথায় যাবে তাদের দুর্দশার কথা জানাতে?

কিছুদিন আগে একটি সংক্রিয় সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও দেখেছিলাম যেখানে এক সংখ্যালঘু পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের ঠেলে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ভিডিওটি দেখার পর আমার মনে হয়েছিল যেন কারো মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। আর আমরা তো জানিই, দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বাতাসও রুদ্ধ হয়ে যায়।

আমরা যারা নিজেদেরকে সংখ্যাগুরু বলি, আমাদের কি কিছুই করার নেই? সমাজের অংশ হিসেবে আমাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই এই সংঘর্ষ প্রতিরোধে? অবশ্যই আছে। প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে এবং প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তা সে যেই ধর্মেরই হোক না কেন। আর, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সহ অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংবেদনশীলতা এবং সহনশীলতা সম্পর্কে শিক্ষাদান করতে হবে।

আমার মনে হয়, একদিন হয়ত এমন দিন আসবে যখন থানায় যাওয়া মানে নিরাপত্তাহীনতার ভয় নয়, বরং ন্যায়বিচারের আশ্বাস। তবে সেই দিন আসবে কবে? পাঠকদের মতামত জানতে ইচ্ছা করে, আমরা সবাই মিলে কেমন করে এই পরিবর্তন আনতে পারি? আমাদের কি আরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত, নাকি শুধু অপেক্ষা করা উচিত প্রশাসনের দয়া দাক্ষিণ্যের জন্য?

By arjun