সামাজিক মাধ্যমের আলো-আঁধারিতে ডুবে থাকা সময়ে, যখন আমরা প্রত্যেকেই নিজের মত করে দুনিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত, তখন হঠাৎ করেই এক অন্যরকম ট্রিগারের সম্মুখীন হলাম আগস্ট ২০২৩-এ। হ্যাঁ, আমি বলছি সেই হেট–ক্যাম্পেইন ও মব–অ্যাটাকের কথা, যা সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনের গলিতে গলিতে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। ‘ট্রিগার মাস’ নামক এই ঘটনাপ্রবাহ যেন আমাদের সবার জন্য এক অজানা আতঙ্ক নিয়ে এসেছিল।

এই সময়টা ছিল এমন, যখন আমরা সমাজের বিষয়বস্তু নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য হয়েছিলাম। সামাজিক মাধ্যমগুলোর সুগন্ধী মোড়ক খুলে পেছনে যা লুকিয়ে ছিল তা আমাদের চমকে দিল। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম যেন এক ধরনের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। যেন সবাই একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়েছিল। আর সেই যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র ছিল শব্দ। হেট-ক্যাম্পেইন, যার মাধ্যমে মানুষ মুহূর্তের মধ্যেই কারোর জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে পারে।

এই সময়ে আমি লক্ষ্য করলাম, আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সেটা অপ্রত্যাশিত এক গণবিষ্ফোরণ সৃষ্টি করছে। বিশেষত আগস্ট মাসের টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক মাধ্যমে এমন কিছু বিষয় সামনে এল, যা আমাদের চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ধর্ম, রাজনীতি, ব্যক্তিগত মতামত – প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছিল।

সিনেমা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, এমনকি ব্যক্তিগত ভিডিও পোস্ট – কিছুই যেন এই ক্যাম্পেইনের বাইরে ছিল না। হঠাৎ করেই যেন প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি মন্তব্য, প্রতিটি শেয়ারে কোন না কোন পক্ষের প্রতি উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছিল। কেউ হয়তো নিজের মতামত জানাতে চাইল, অন্য কেউ সেটার একেবারে উল্টো দিক থেকে আক্রমণ করল। এই ক্ষেত্রে, আমাদের সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিদ্বেষ যেন প্রকাশ পাচ্ছিল।

কিন্তু এই হেট ক্যাম্পেইন কি শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ ছিল? উত্তর হলো না। আমরা দেখেছি, এই অনলাইন বিদ্বেষের আগুন কখনো কখনো বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলছে। আগস্ট মাসের সেই দিনগুলোতে মব-অ্যাটাকের ঘটনাগুলো বারবার আমাদের কাঁপিয়ে দিয়েছে। কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও জাতের নামে, কোথাও আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে মানুষজনের উপর আক্রমণ চালানো হচ্ছিল। এ যেন এক ধরনের সামাজিক ভাইরাস, যা আমাদের সমাজে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছিল।

এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে দাঁড়িয়ে, আমি বুঝতে পারছিলাম আমাদের সমাজের মধ্যে বিদ্যমান এই আচরণের কারণ কি হতে পারে। অনলাইনে যারা এই হেট স্প্রেড করছে, তারা কি সত্যিই এতোটা শক্তিশালী? নাকি আমাদের ভেতরে থাকা অজ্ঞাতসারে লুকিয়ে থাকা ঘৃণাই তাদের এই কাজ করতে উৎসাহিত করছে? হয়তো উভয়ই।

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, এই হেট ক্যাম্পেইন কখন আমাদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে তা বুঝতেই পারি না। এমনকি কখনো কখনো আমরা নিজেরাও অজ্ঞাতভাবে এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যাই। সামাজিক মাধ্যমে আমরা যা দেখছি, তা নিয়ে অবচেতনভাবেই মত গঠন করছি এবং সেই মতামতগুলো কখনো কখনো এমন আকার নিচ্ছে যা বাস্তব জীবনে সমস্যা তৈরি করছে।

এই সময়ে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে কিছু বিশ্লেষণ। যখন দেখি, একেকটা পোস্ট বা ভিডিও মূহুর্তের মধ্যেই লাখ লাখ শেয়ার এবং কমেন্ট পাচ্ছে, তখন ভাবি এই সব মানুষের মনে কি চলছে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের মধ্যে কতজন আসলে বুঝে বা জেনে এই কাজ করছে? যদিও এটি জানা সম্ভব নয়, তবুও একটি বিষয় পরিষ্কার – হেট ক্যাম্পেইনের পেছনে একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা রয়েছে যা মানুষকে প্রভাবিত করছে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা কি করতে পারি? সামাজিক মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ববান হওয়া উচিত। আমরা যা দেখছি তা নিয়ে সহজে মতামত গঠন না করা, এবং অন্যদের প্রতি সম্মান বজায় রাখা হল একটি মহৎ উপায়। আমাদের উচিত হবে যে কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে মতামত প্রকাশ না করা, এবং সর্বদা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা।

সবশেষে, এই আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের সামনে নিয়ে আসল যে সমাজের এই বিদ্বেষপূর্ণ ধারা বন্ধ করার জন্য আমাদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজে বিদ্যমান ঘৃণা বন্ধ করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, এই হেট ক্যাম্পেইন এবং মব-অ্যাটাকগুলো শুধুমাত্র আমাদের ভাঙার জন্য তৈরি হয়েছে। আমাদের উচিত হবে এই ধারা থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে প্রত্যেককে একসাথে কাজ করা।

তাহলে, এখন কি আমরা প্রস্তুত এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে? সেটাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

By arjun