আমাদের ছোট্ট এই দেশটা যে কীভাবে এত অল্প সময়ে এতটা দূর এগিয়ে এসেছে, সেটা ভাবতেই মনটা ভরে যায়। তবে ২০২৩-এর শেষে এসে আমাদের কিশোর-কিশোরীরা যে প্রশ্নটা বার বার করছে, তা হলো: “এ দেশেই কি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব?” এটা কোনো ছোট প্রশ্ন নয়, বরং আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভিতরকার এক বড় সংশয়। তারা আমাদের ছেড়ে যাওয়া দিনগুলো থেকে শিখতে চায় এবং আগামী দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে চায়। তাদের এমন জিজ্ঞাসা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

এখন যদি আমরা একটু পেছনে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির এক দীর্ঘ যাত্রা। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেশটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং সেগুলো পার করে এসেছে। এই সময়কালে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ, ডিজিটালাইজেশন, অবকাঠামো উন্নয়ন সবকিছুর সমন্বয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপান্তর ঘটেছে। আর এই কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই দেশে দারিদ্র্য কমেছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা থাকলই: আমাদের তরুণরা কি এই পরিবর্তনের সুফল ভোগ করছে?

২০২০-এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব আমাদের অর্থনীতিকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। তবে দ্রুতই আমরা সেই সংকট কাটিয়ে উঠি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত বড় বড় প্রকল্পের কাজ চলতে থাকে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সেই সাথে যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো আমরা কি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও আঞ্চলিক অসমতা মোকাবিলা করতে পারছি?

আমাদের তরুণ প্রজন্মের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো কর্মসংস্থান। দেশে জিডিপি বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও স্ফীত হয়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ কি সেভাবে তৈরি হয়েছে? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আমাদের তরুণদের সেই দক্ষতা দিচ্ছে যা আধুনিক বাজারে প্রয়োজন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, আমাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাত এখনও কিছুটা পিছিয়ে আছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ আমাদের সুযোগ দিয়েছে, তবে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার কতটা করতে পেরেছি, সেটাও এক বড় প্রশ্ন।

আরেকটি বড় বিষয় হলো সামাজিক নিরাপত্তা। তরুণ প্রজন্ম যে নিরাপত্তার কথা বলছে, তা শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নয়, বরং একটি নিরাপদ সমাজব্যবস্থা যার ওপর তারা নির্ভর করতে পারে। রাস্তার নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর প্রতি সহিংসতা এসব বিষয়কেও আমাদের গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। ২০২৩ সালের বাংলাদেশ হয়তো অনেক দিকে এগিয়েছে, কিন্তু এই কিছু দিক এখনও আমাদের পিছিয়ে রাখছে।

একজন সাধারণ বাংলাদেশী হিসেবে আমারও এই বিষয়গুলি নিয়ে অনেক ভাবনা আছে। আমাদের এই তরুণ প্রজন্মের মনের মধ্যে যে সংশয় রয়েছে, তা দূর করতে হলে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রতিটি তরুণ তাদের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য সঠিক সুযোগ পায় এবং সেই সাথে আমরা যেন একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

শেষে এসে আমি বলতে চাই, আমাদের তরুণ প্রজন্মই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের এই সংশয়কে আমরা অগ্রগতির পথে এক বড় সুযোগ হিসেবে নিতে পারি। দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা, তাদের উচ্ছ্বাস, তাদের জিজ্ঞাসা এসবই আমাদের জাতীয় উন্নয়নের দিশা দেখাতে পারে। তাই, আসুন আমরা সবাই মিলে এই প্রশ্নের সম্মিলিত উত্তর খুঁজে বের করি: “এ দেশেই কি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব?” আমি বিশ্বাস করি, সম্ভব। শুধু প্রয়োজন সবাই মিলে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এবং সঠিক পরিকল্পনা। তাহলে আমরা নিশ্চয়ই এক সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তুলতে পারব আমাদের কিশোর-কিশোরীদের জন্য।