মহামারির ভেতরেই জমি–দখলের হটস্পট হয়ে উঠছে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল

এই পৃথিবীটা কি একটু বেশি অদ্ভুত লাগছে না? একদিকে আমরা মহামারি নিয়ে মাথা ঘামাতে ব্যস্ত, অন্যদিকে জীবন থেমে নেই । এই মহামারির সময়েও একটা জায়গায় থেমে নেই সময় জমি দখলের রাজনীতি। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। আমি বলছি আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কথা, যেখানে মহামারি কেবল মানুষের স্বাস্থ্য নয়, জমির ওপরও প্রভাব ফেলছে।

ভাবছেন, মহামারি আর জমি দখলের মধ্যে সম্পর্কটা কী? আসুন, একটু ঘুরে দাঁড়াই। আমাদের এই অঞ্চলে জমির দখল সব সময়ই একটা বড় সমস্যা। কিন্তু এই মহামারির সময়ে সবকিছু যেন একটু বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাস আমাদের সাধারণ জীবনের গতি কমিয়ে দিয়েছে, লকডাউনে আমরা ঘরবন্দি। কিন্তু জমি দখলকারীদের জন্য এ এক অদ্ভুত সুযোগ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এখন অনেক জায়গায় জমি দখলের ঘটনা বেড়েই চলছে। এমনকি জমির মালিকরাও বিষয়টি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে পারছেন না, কারণ তাদেরও করোনা নিয়ে চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

আমি যখন এই বিষয়টি নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয়, আমাদের সমাজের এই অন্ধকার দিকটি কি কখনোই পাল্টাবে না? জমি দখলের সমস্যা আমাদের দেশে নতুন নয়, কিন্তু মহামারির মধ্যে এর এতটা বৃদ্ধি আমাকেও অবাক করে দেয়। যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তারা এই দুর্যোগের সময়েও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত। যেমন, অনেক জায়গায় সরকারি জমিও ব্যক্তিগত দখলে চলে যাচ্ছে। এই জাতীয় কার্যকলাপ গভীর উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত, কিন্তু আমাদের ভেতরে কোথাও একটা স্থবিরতা ভর করেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কথা বলছিলাম, এই অঞ্চলটা আমার খুব পরিচিত। ফলে এখানকার মানুষের চিন্তা-ভাবনা এবং জীবনযাত্রার সাথে আমি বেশ পরিচিত। এখানে অনেক কৃষকের জমি দখল হয়ে গেছে, যারা এই জমির ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন দিশেহারা। মহামারির সময় তারা তাদের জমির ওপর নজর রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে এবং দখলদাররা এই দুর্বলতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এছাড়াও, লকডাউন চলাকালে জমির পরিদর্শন বা কাগজপত্র যাচাই করার কাজও পিছিয়ে গেছে, ফলে জমি দখলের ঘটনা আরও বেড়েছে।

কিন্তু এই জমি দখলের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থই নয়, রাজনৈতিক সমীকরণও জড়িয়ে আছে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্ষমতার জোরে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছেন। তারা জানেন, এই সংকটময় সময়ে কেউ খুব একটা প্রতিবাদ জানাবে না। পুলিশ প্রশাসনও মহামারির কারণে এত ব্যস্ত যে, এই ধরনের সমস্যায় তাদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ কমই আছে।

এখন আপনারা ভাবছেন, এই সমস্যার সমাধান কী হতে পারে? আমি যদি বলি, এই সমস্যার সমাধান সহজ নয়, তাহলে তা কোনো অতিরঞ্জিত কথা হবে না। তবে আমাদের সচেতনতা এবং ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগই এই সমস্যার সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। যারা জমি হারিয়েছেন বা হারানোর পথে আছেন, তাদের উচিত একসঙ্গে এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। মহামারির সময়েও যদি তারা একত্রিত হতে পারেন, তবে দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

তাছাড়া, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। জমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে দ্রুত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ। সরকারকে এই সমস্যার প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। আমাদের আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধান করতে হবে।

এত কিছুর পরেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায় আমাদের সমাজ কি এই ধরনের অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম হবে? মহামারি আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে, মানুষের জীবন অমূল্য। তাহলে কেন আমরা একে অপরের জীবনের ওপর এমন আঘাত করি? জমি দখলকারী এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কি কখনো ভাবেন না, তারা এই সমাজেরই অংশ? মহামারি আমাদের একসঙ্গে থাকতে শিক্ষা দিয়েছে, তবে কেন আমরা এই শিক্ষা ভুলে যাচ্ছি?

শেষমেশ আমি বলতে চাই, আমাদের সমাজে বিনিয়োগ করতে হবে সঠিক মানসিকতা এবং ঐক্যবদ্ধ চেতনায়। জমির দখল হওয়া মানে শুধু জমি হারানো নয়, এর প্রতিটি অংশের সাথে জড়িয়ে থাকে জীবনের গল্প। এই গল্পগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে, একসাথে থেকে আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিতে হবে। মহামারি হোক বা না হোক, জমি দখলের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম যেন কখনো থেমে না যায়। আমরা কি সত্যিই তা পারব?

By sukanta