জুলাই মাস মানেই আমাদের দেশে একটা বিশেষ উন্মাদনার সময়। বর্ষা মৌসুমের শুরু, ধানের ক্ষেতে নতুন সবুজের স্বপ্ন এবং একই সাথে জমি-বাড়ি নিয়ে নতুন করে বিরোধের মরসুম। গ্রামাঞ্চলে জমির মালিকানা ও সীমা নিয়ে যত কথা, তার কোনটার শেষ হয় না। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঐতিহাসিকভাবেই এই জমি নিয়ে বিরোধ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতেও সেই চিত্রে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বরং এখন জাল দলিল আর পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে নতুন এক ধরণের ব্যবসা শুরু হয়েছে। বিষয়টি ভাবতেই অদ্ভুত লাগে, তাই না?

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বললেই মনে পড়ে, কিভাবে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি প্রথার উদ্ভব হয়েছিল। সেই জমিদাররা দেশের সম্পদের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখত। তখন থেকেই জমি নিয়ে বিরোধ শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে তা সমাজের এক গভীর সমস্যায় পরিণত হয়। ব্রিটিশদের পর পাকিস্তান আমলে জমির একাধিক মালিকানা পেয়েও মানুষ শান্তি পায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের পরেও এই সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং দিন দিন তা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

এখন আপনি যদি বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন জমির কাগজপত্রের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। জাল দলিলের কারবার এখন খুবই সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দালালদের মাধ্যমে সহজেই তৈরি করা হয় ভুয়া দলিল, যা পরে জমির আসল মালিকদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। এই জাল দলিলের কারবার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক সময় সত্যিকারের দলিলকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। আর এর ফলস্বরূপ দেখা দেয় জমির মালিকানা নিয়ে অসংখ্য মামলার সারি।

এখন কথা হলো, কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়? প্রথমত, জমি সংক্রান্ত আইনি ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে হবে। যারা জাল দলিলের সাথে জড়িত, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জমির রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একবার রেকর্ড ডিজিটাল হয়ে গেলে, জাল দলিল তৈরি করার সুযোগ অনেকাংশেই কমে যাবে।

পুলিশ প্রটেকশন ব্যবসার কথায় আসি। জাল দলিলের সাথে জড়িত চক্র জমি দখলের জন্য পুলিশ প্রটেকশন নেয়া শুরু করেছে। এটা কি ভাবা যায়? পুলিশের কাজ আমাদের নিরাপত্তা দেয়া, কিন্তু এখানে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে অন্যায় কাজে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পুলিশকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এটা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মোটেও সুখকর নয়। বরং এর ফলে সমাজের ভেতরে পুলিশের প্রতি যে আস্থা থাকা উচিত, সেটাই নষ্ট হচ্ছে।

তাহলে, আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে জমির ব্যবসা আর পুলিশ প্রটেকশন একসাথে চলে? যেখানে নিরীহ মানুষ তার নিজের জমির নিরাপত্তা নিয়েই চিন্তিত? আমাদের উচিত এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা। আমাদের যেমন প্রয়োজন সঠিক আইনি ব্যবস্থা, তেমনই দরকার সামাজিক সচেতনতা। জমির সঠিক মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের প্রজন্মকে বুঝতে হবে যে, জমি শুধু সম্পদ নয়, তা আমাদের অস্তিত্বের অংশ। সেই অস্তিত্ব রক্ষায় আমাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।

জুলাই মাসের জমি-বাড়ির বিরোধ যেন একটা গ্রীষ্মের ঝড়ের মতো। তা এসে ধ্বংস করে যায় আমাদের শান্তি, আমাদের বন্ধন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই ঝড়কে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত? আমরা কি জমি নিয়ে বিরোধ আর জাল দলিলের এই চক্র ভাঙতে পারব? নাকি আমরা চিরকাল এই চক্রেই আবদ্ধ থাকব? আপনার কি মনে হয়? আমাদের কী করা উচিত এই সমস্যার সমাধানে?