### আগস্টের আগে থেকেই গুজব–কারখানা গরম: ‘ওদের ঘরে অস্ত্র’ এমন গল্পে উস্কানি
বন্ধুরা, আজকে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাই, যেটা আমাদের সমাজের জন্য কখনো কখনো বেশ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যখন সেই মাসটা আগস্ট হয়, তখন গুজব–কারখানার চাকা যেন আরও দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। আমাদের দেশে গুজবের ভয়াবহতা নতুন কিছু নয় আমরা সবাই কমবেশি এর ভুক্তভোগী। আজ বলব কিভাবে আগস্ট মাসের আগে থেকেই নানা ধরনের গুজব আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং এর প্রভাব আমাদের উপর কেমন হতে পারে।
আগস্ট মাস, আমাদের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষ মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই কারণেই এই মাসটি সবসময়ই সংবেদনশীল এবং নানা ধরনের ষড়যন্ত্র, গুজব এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই সময় শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং ধর্মীয় গুজবও মাথাচাড়া দিতে পারে। আপনি যদি একটু খেয়াল করেন, দেখবেন এই সময় অনেকেই এমন কিছু কথাবার্তা শুরু করে যা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। গুজব ছড়িয়ে সমাজকে বিভ্রান্ত করার এমন নোংরা খেলা যারা খেলে, তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে চায়।
এখন আসুন, আমরা একটু গভীরে যাই। ‘ওদের ঘরে অস্ত্র’ এই ধরনের গুজব কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে? যারা একটু সংবেদনশীল, তারা হয়তো ভাববে, একটা পরিবারের ঘরে কেন অস্ত্র থাকবে? কিন্তু যারা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না, তাদের জন্য এটাই একটা চমকপ্রদ গল্প শুরু হয় মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার পালা। কেউ একজন হয়তো নির্দিষ্ট কোনো পরিবার বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথা ছড়াল। এমন হলে বাকিরা অন্ধভাবে সেই কথার পেছনে ছুটে, সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের বালাই নেই। এমন গল্পে উস্কানি দিতে হয়তো খুব বেশিবার ফোন করা লাগবে না একবার বললেই হলো। এরপর সেটা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যায় দূর-দূরান্তে।
বন্ধুরা, এখন কথা হচ্ছে এ ধরনের গুজবের পেছনে কারা থাকে? সহজ কথায় বললে যারা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায় এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়, তারাই এসবের পেছনে থাকে। এরা হতাশ মানুষকে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু বানায়। যেমন ধরুন, যাদের কাছে চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ, যারা সমাজে অবহেলিত তাদের মধ্যে এই গুজবগুলোর প্রভাব বেশি পড়ে। এরা নিজেরাই হয়তো এমন কিছু ছড়িয়ে দেয় যার জন্য পরবর্তীতে নিজেদেরই ভুগতে হয়। তাদেরকে বোঝানোও বেশ কঠিন যে, গুজব আসলে কিভাবে তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে দিচ্ছে।
আমরা যদি একটু খেয়াল করি, দেখব যে গুজব–কারখানা গরম করার পেছনে কিছু সাধারণ কৌশল থাকে। প্রথমত, তারা কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে ব্যবহার করে। যেমন আগস্ট মাসের কথা বলা হচ্ছে, যেহেতু এই সময়টা আমাদের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল, তাই সেই সময়ে গুজব ছড়ালে মানুষের মনে তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা বেশি। দ্বিতীয়ত, তারা সাধারণত এমন কথা ছড়ায় যা মানুষের মনে আতঙ্ক বা উস্কানি সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর কাজটি করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো আছেই, সাথে আছে বিভিন্ন ভুয়া নিউজ পোর্টাল যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এসবের মাধ্যমে তারা খুব দ্রুততার সাথে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে।
তাহলে বন্ধুরা, আমরা কি এই গুজবের প্রভাব এড়াতে পারি না? অবশ্যই পারি। প্রথমেই আমাদের নিজেদেরকে সচেতন করতে হবে। গুজব শুনলেই তাকে যাচাই না করে বিশ্বাস করা উচিৎ নয়। আমরা নিজেরা যদি একটু সময় নিয়ে সত্য-মিথ্যা যাচাই করি, তাহলে আমাদের খুব বেশি বিভ্রান্ত হবার দরকার হবে না। এছাড়া আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজের দায়িত্ব তাদের আশেপাশের মানুষকে সচেতন করা, যাতে তারা গুজবে বিভ্রান্ত না হয়। এছাড়া সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া উচিত যাতে গুজব ছড়ানোর পথগুলো বন্ধ করা যায়।
এখন শেষ কথা হচ্ছে, আমরা কি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো যদি এই গুজবের কারখানাগুলো বন্ধ না হয়? এই প্রশ্নটার উত্তর আমাদের সবাইকে খুঁজতে হবে। নিজেদের ভেতর একতা এবং সংহতি বজায় রেখে, একে অপরকে সহযোগিতা করে, সকল ধরণের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য থেকে দূরে থেকে এবং সঠিক তথ্যের প্রচার করে আমরা কি আমাদের সমাজকে আরও উন্নত করতে পারবো না? এটা আমরা সবাই মিলে ভাবনা চিন্তা করলেই সম্ভব। আমার মতে, সত্যিকার অর্থে আমাদের নিজেদেরকেই এসব গুজবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, নিজেদেরই সচেতন হতে হবে এবং অন্যদেরও সেই পথে আনতে হবে। কারণ একা প্রশাসন, একা সরকার কিছুই করতে পারবে না, যদি আমরা নিজেরা সচেতন না হই। তাই বন্ধুরা, আসুন আমরা সবাই মিলে গুজবের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলি এবং আমাদের সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করি।
