মন্দির–বাড়িতে ছোট ছোট হামলা, স্থানীয় প্রশাসনের ভাষায় ‘ঝামেলা নাই’

আমাদের দেশের মন্দিরগুলোতে হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়, যদিও স্থানীয় প্রশাসন এসবকে ‘ঝামেলা নাই’ বলে উড়িয়ে দেয়। আসলে এই সমস্যা শুধুমাত্র ধর্মীয় সহিংসতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এতে আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দায়িত্বহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একটা সময় ছিল যখন আমি নিজেও ভাবতাম, এতো ছোটখাটো ঝামেলা, সবার বাড়িতেই তো হয়। কিন্তু যখন নিজের চোখের সামনে দেখলাম, তখন বুঝলাম এর গভীরতা। আমার এক বন্ধু, সে একজন সেবক, সিলেটের একটি ছোট্ট মন্দিরের দেখাশোনা করতো। একদিন সকালে সে আমাকে ফোন করে জানালো যে, রাতের বেলায় কিছু লোক এসে মন্দিরের গেট ভেঙে ঢুকে পড়েছে। মন্দিরের কিছু অংশ তছনছ করেছে, আর কিছু মূল্যবান জিনিস চুরি করেছে। এটা শোনার পর আমি অবাক হয়ে গেলাম, কারণ আমার ধারণা ছিল না যে এমন ঘটনা সত্যিই ঘটে।

এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমাদের দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। কিন্তু প্রত্যেকবারই কোনো না কোনোভাবে এসব ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন থেকে বলা হয়, ‘এটা ছোটখাটো ব্যাপার, চিন্তার কিছু নেই’। কিন্তু বাস্তবে, এসব ঘটনা লোকেদের মনে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাদের মনে প্রতিদিনই এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও ভীতির ছায়া ঘোরে।

আমাদের দেশে সাধারণত মামলা-মোকদ্দমা পেরোতে অনেক সময় লাগে। কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথমে থানায় রিপোর্ট করতে হয়। তারপর পুলিশ আসে, তদন্ত করে। সবশেষে যদি মামলা হয়ও, সেটা আর কতদূর এগোয় তা সংশয় থেকে যায়। এর মধ্যে অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন স্থানীয় রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়, তদবির হয় এসব মামলা তুলে নিতে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আবার এই সব হামলার বিষয়ে মুখ খোলে না।

একদিন আমার এক কলিগের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। সে বললো, ‘দেখো, এই ঘটনা তো নতুন না, কিন্তু যে জিনিসটা সবচেয়ে ভয়ানক সেটা হলো আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া। আমরা এসবকে তুচ্ছ হিসেবে মেনে নিয়েছি।’ তার এই কথাটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। আমরা তো সবসময় শান্তি, সম্প্রীতির কথা বলি, তাহলে এসব ঘটনা কেন ঘটে এবং কেন আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?

আমার নিজের কিছু অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই। একবার নববর্ষের সময় আমি কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। সেখানকার একটি মন্দিরে ঢুকে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রার্থনায় মানুষের ঢল, সবার মনে এক ধরনের আত্মিক শান্তি। কিন্তু সেই শান্তির আবহ অনেক সময়ই কিছু অসৎ লোকের দ্বারা বিঘ্নিত হয়। মন্দিরগুলোয় হানা দেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো আতঙ্ক সৃষ্টি করা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে। এ ধরনের হামলা কেবল সম্পত্তির ক্ষতি করে না, বরং মানুষের নিরাপত্তার উপরও প্রভাব ফেলে।

আমরা যদি এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে দায়িত্বশীল হতে হবে, এবং সঠিকভাবে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমরা যদি সত্যিই একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গড়তে চাই, তাহলে আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে এবং এসব ঘটনা মোকাবিলা করতে হবে।

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এ ধরনের ঘটনার প্রতিরোধ প্রয়োজন। আর এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। আমাদের দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং সহনশীলতার মতো গুণাবলীকে কাজে লাগাতে হবে। সবশেষে, একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, আমরা কি এমন একটি দেশ গড়তে পারি যেখানে কোনো ধর্মীয় স্থান বা সম্প্রদায়ের উপর হামলা হবে না, এবং সকলেই শান্তিতে বসবাস করতে পারবে? যদি আমরা সবাই এই লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হই, তবে আমার বিশ্বাস, সেটা অসম্ভব কিছু নয়। আমাদের একসাথে কাজ করে একটি সহিংসতামুক্ত, সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ে তুলতে হবে। কেবলমাত্র একই সাথে কাজ করলেই আমরা সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবো।

By sukanta