আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে মেয়েদের উপর যৌন হয়রানি একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিষয়টা নিয়ে কফি টেবিলে আড্ডা দিতে বসলে অনেকের কাছ থেকেই শুনতে পাবি যে, “এটা তো নতুন কিছু না”, কিংবা “মেয়েরা একটু সাবধান হলেই তো হয়।” কিন্তু কি জানিস, সমস্যা তো এখানেই। আমাদের এই “সাবধান” থাকার শিক্ষা, এই নীরব থাকার প্রবণতা এগুলোই আসলে সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। আর যখন বিষয়টা মাইনরিটি মেয়েদের নিয়ে হয়, তখন এই সমস্যার গভীরতা আর তীব্রতা যেন কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে মাইনরিটি মেয়েদের যৌন হয়রানি এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে তাদের যে হুমকির সম্মুখীন হতে হয়, সেটা একটা চলমান বাস্তবতা। এই হুমকিগুলো কেবল তাদের শারীরিক বা মানসিকভাবে ভয় দেখায় না, বরং তাদের সমাজে বেঁচে থাকার অধিকারের উপরও আঘাত হানে। অনেক সময় এমনও শোনা যায় যে, “অভিযোগ করলে সমাজে বাঁচতে দিব না।” এসব হুমকি শুনতে সাধারণ মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা ভয়ানক বাস্তবতা মাইনরিটি মেয়েদের জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।
আমার এক ঘনিষ্ঠ পরিচিত আছে, যার গল্প শোনার পর আমার মনটা ভীষণ ভারী হয়ে গিয়েছিল। সে আমাদের দেশের এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়ে। তার সাথে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার কথা বলেছিল। একদিন রাস্তা দিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে স্থানীয় কিছু যুবক তাকে বিরক্ত করছিল। সে সেই ঘটনার প্রতিবাদ করায় তার বাড়ির লোকজনকে নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়। “তোমাদের মেয়ে যদি বেশি কথা বলে, তাহলে তাকে আর স্কুলে পাঠাইও না, নইলে ভালো হবে না।” এসব কথা শোনার পর তার পরিবার ভয়ে তাকে স্কুল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। এই গল্পটা কেবল তার নয়, এ যেন হাজারো মাইনরিটি মেয়ের প্রতিদিনের গল্প।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাইনরিটি মেয়েদের যৌন হয়রানি একটা গভীর সমস্যা। আমাদের দেশে অনেক ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে। তাদের মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া অপরাধগুলো খুব কমই প্রকাশ্যে আসে। এর প্রধান কারণ হলো সমাজের চাপ এবং অপমানের ভয়। অনেক সময় এসব ঘটনা ঘটে স্থানীয় মুষ্টিমেয় প্রভাবশালীদের দ্বারা, যারা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিষয়গুলো চাপা দেয়। এছাড়াও অভিযোগ করলে মেয়েদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেয়া হয়। এই হুমকিগুলো তাদের আত্মবিশ্বাসকে চূর্ণ করে এবং নীরবে কষ্ট সহ্য করতে বাধ্য করে।
এই সমস্যার বিরুদ্ধে আমাদের দেশের আইন এবং বিচার ব্যবস্থা যে যথেষ্ট সচেতন নয়, তা কিন্তু নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাইনরিটি মেয়েদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধা আছে। অনেক সময় থানায় অভিযোগ নেয়া হয় না, কিংবা অভিযোগ করলেও যথাযথ তদারকি হয় না। আর যেই পরিবারগুলো এ বিষয়ে মুখ খুলতে চায়, তাদেরকে স্থানীয়ভাবে চাপে ফেলা হয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মাইনরিটি মেয়েদের যৌন হয়রানি নিয়ে বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেমন, নেপালে সংখ্যালঘু মেয়েদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য বিশেষ আইন প্রচলন করা হয়েছে। ভারতে বিভিন্ন সংখ্যালঘু গ্রুপের জন্য বিশেষ কমিশন কাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধরনের উদ্যোগ বা কমিশন খুবই অপ্রতুল।
এই সমস্যা সমাধানে আমাদের দরকার সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। আমাদের উচিত মাইনরিটি সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এবং তাদেরকে সমাজের সমান নাগরিক হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করা। এছাড়াও প্রতিবেদনের পরিমাণ বাড়াতে এবং প্রমাণ সংগ্রহে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
ভবিষ্যতে যদি এই সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে আমাদের সমাজে মাইনরিটি মেয়েদের উপর চাপ সৃষ্টি হয়ে থাকবে। তাদের শিক্ষা, কাজ এবং সামাজিক জীবনে প্রভাব পড়বে। এটা তো শুধু কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়, এটা আমাদের পুরো সমাজের সমস্যা। আর এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আমাদেরকে সবাইকে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে।
তবে সবশেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় আসলেই আমরা কি মাইনরিটি মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারছি? আমাদের সমাজ কি আদৌ তাদের জন্য সুরক্ষিত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে আমাদের সমাজকে অনেক দূর পথ যেতে হবে। আমাদের উচিত এই সমস্যার গভীরতা বুঝে এর প্রকৃত সমাধান খুঁজে বের করা। আর যদি আমরা সেটা না করতে পারি, তাহলে শুধু মাইনরিটি মেয়েরা নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
