শিরোনামটা পড়েই বুকের ভেতর একটা গুড়গুড় শব্দ হলো, যেন কোনো অশনি সংকেত দিচ্ছে। “‘তুই হিন্দু, তাই আগে চাকরি গেল’ করোনা–পরবর্তী ছাঁটাইতে ধর্মীয় ফিল্টার। এই বাক্যটা শুনেই মনে হয় সেটা কোনো দুঃস্বপ্ন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এটা বাস্তব, এবং এটাই হয়তো বাংলাদেশের মতো একটি বহুধর্মীয়, বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আমাদের কঠিন বাস্তবতা।

করোনা ভাইরাস মহামারির এত দিন পর, অনেক কিছুই বদলে গেছে। মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, সব কিছুতেই একটা স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে এই মহামারি। আমি নিজে দেখেছি, কিভাবে আমার পরিচিতদের মধ্যে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, কিভাবে ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে ছাঁটাইয়ের ঘটনা শুনে কিছুটা হতবাক হয়েছি। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কি সত্যিই এতটা পেছনে পড়ে গেছি? এই দেশে যেখানে হাজার বছরের একসঙ্গে বসবাসের ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে ধর্মীয় বিভেদ যেন আমাদের মানবিকতাকে ক্রমশ গ্রাস করছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, করোনা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছাঁটাইয়ের সময়ে বেশ কিছুরকম অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে, এর মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে ছাঁটাইয়ের ব্যাপারটি সবচেয়ে বেশি চিন্তার। এর আগে আমরা জানতাম, চাকরি হারানোর কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক চাপ, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা, বা প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা কমে যাওয়ার জন্য কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনা। কিন্তু ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে ছাঁটাইয়ের ঘটনা আমাদের সমাজে এক নতুন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।

আমার এক বন্ধু, নামটা উল্লেখ না করাই ভালো, ওর কথা মনে হচ্ছে। ও ব্যাংকে কাজ করতো। বেশ ভালো পদেও ছিল। হঠাৎই ওর চাকরি চলে গেল। শুনলাম, ওর বস নাকি সরাসরি বলেছে, “আমরা কিছু পরিবর্তন আনতে চাই, তাই কিছু কর্মী কমানো হচ্ছে।” কিন্তু বাস্তব ঘটনা হলো, ওর মতো আরও কয়েকজন হিন্দু সহকর্মীকেও একই সময়ে ছাঁটাই করা হলো। আর প্রায় সব জায়গাতেই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখা গেছে।

এই ঘটনাগুলো কেবল চাকরির বাজারে নয়, বরং মানুষের মনেও একটা বিভক্তি তৈরি করছে। আমাদের সমাজে যেখানে এতদিন সহাবস্থান ছিল, সেটা কি ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে? একথা বলতেই হবে যে, উচ্চস্তরের নীতিনির্ধারকদের সমস্যাটা এখানেই। আমাদের রাজনীতিবিদরা চিরকাল দোষারোপ করতে ভালোবাসেন, কিন্তু নিজেদের গলদ কখনই স্বীকার করেন না।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের সমাজের মূল কাঠামো যদি এই ধরনের ধর্মীয় বিভেদের হাত থেকে বের হয়ে না আসে, তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে থাকব? বেশিরভাগ মানুষই সোশ্যাল মিডিয়াতে নানা মতামত দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবিক পরিবর্তনের জন্য কেউ কি কাজ করছে?

আমরা যদি বিশ্বব্যাপী তাকাই, তবে দেখব যে, ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে কত ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা বিশেষত চিন্তার বিষয়। কারণ আমরা সবসময় বলে আসছি, “আমাদের দেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে উঠেছে।” কিন্তু এই চেতনা হারিয়ে গেলে আমরা কেবল কলঙ্কিত হব না, বরং আমাদের সমাজের মূল ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাবে।

ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বৈষম্যের এই কালো ছায়া যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে আমাদের সামাজিক পরিকাঠামোতে ভয়ানক ফাটল ধরবে। যে বাঙালি চেতনা আমাদের একত্রিত রেখেছে এতকাল, সেটাই যদি ভেঙে যায়, তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমরা কি রেখে যাচ্ছি?

মহামারির সময় আমাদের একে অপরকে সাহায্য করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আমরা যদি ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ তৈরি করি, তাহলে মানবিকতার প্রশ্ন উঠবেই। আমরা আশা করছি, এই ঘটনা সমাজের উচ্চস্তরে আলোচিত হবে এবং এর সমাধান খুঁজে বের করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের অসঙ্গতি আর না থাকে।

এই লেখার শেষে এসে আমি একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই আমরা কি আসলেই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, নাকি সেটা শুধু মুখের কথা? যদি আমরা সত্যিই সেই চেতনায় বিশ্বাসী হই, তাহলে কেন এসব ঘটনা ঘটছে এবং এর সমাধান কি হবে? আমাদের কি সময় আসেনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার এবং সত্যিকারের মানবিক সমাজ গঠনের জন্য কাজ করার?

By sayan