প্রতিদিনই আমরা খবরের কাগজে বা টিভির পর্দায় যে সকল ঘটনা দেখতে পাই, তার মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক হল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নতির জোয়ারে ভাসছে বিশ্ব, সেখানে আমাদের দেশে এখনও কেউ কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, আহত হচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে। সম্প্রতি ইনডেক্স করা সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর এক গবেষণা আমাদের জানাচ্ছে যে গত এক বছরে কতজন এই ধরণের নৃশংসতার শিকার হয়েছেন, আর কত পরিবার এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংখ্যাগুলো পড়ে রীতিমতো গায়ে কাঁটা দেয়। এই সংখ্যা শুধুই পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের কান্না, কষ্ট আর অসহায়ত্বের কাহিনী। তবে প্রশ্ন হল, আমরা কেন এখনও এই স্তরে অবস্থান করছি? এর পেছনে কি শুধুই কোনো এক দিকে আঙ্গুল তোলা যায়, নাকি পুরো সমাজেরই কিছু দায়িত্ব থাকা উচিত?

আমার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর একদম স্পষ্ট। তবে হাঁটবো সেই পথে একটু ধীরে, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করেই। ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের এলাকায় অনেক সংখ্যালঘু পরিবার ছিল যাদের সাথে মিশতে আমার খুব ভালো লাগত। দাদা-দাদির কাছে শুনেছি, আমাদের গ্রামে ঈদ-পূজো একসাথে উদযাপিত হত, সবাই সবাইকে সম্মান করত। কিন্তু পরিস্থিতি যেন কেমন বদলাতে শুরু করল। ছোটবেলায় যাদের সাথে একসাথে মাঠে খেলতাম, তাদের কেউ কেউ একদিন আর এপাড়ায় দেখা গেল না। ধীরে ধীরে যেন হারিয়ে যেতে লাগল সেই সম্প্রীতির পরিবেশ।

সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার এবং তাদের নিরাপত্তাহীনতা সম্পর্কে অনেকেই বলেন স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা এবং কখনো কখনো পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণই মূল কারণ। কিন্তু আমি মনে করি, শুধু প্রশাসনকে দায়ী করে আমরা আমাদের নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু কর্তব্য থাকা উচিত। আমাদের চারপাশে কি ঘটছে সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। কেবলমাত্র নিজের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চলবে না, আশেপাশের মানুষদের অসুবিধা নিয়ে ভাবতে হবে।

সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের ঘটনা যখনই ঘটে, তখনই আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ি, প্রতিবাদ জানাই, কিন্তু কয়েকদিন পরেই সব ভুলে যাই। এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পরিবার তাদের প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ভাবুন তো, কতটা দুঃখজনক হবে সেই অনুভূতি যখন কেউ তার শেকড় ছিঁড়ে ফেলার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অবশ্যই সহজ নয়। শুধু নিরাপত্তা নয়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কারণও এর পেছনে ভূমিকা রাখে। যারা দেশ ছেড়ে চলে যান, তারা মূলত নতুন জীবনের সন্ধানে বের হন, কিন্তু সেই নতুন জীবনেরও কি কোনো নিশ্চয়তা রয়েছে? অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অচেনা পরিবেশ এবং নতুন সংস্কৃতিতে মানিয়ে নেয়ার লড়াই তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে।

আমি যখন এই বিষয়টি নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয় আমরা কি সত্যিই আমাদের স্বাধীনতার মূল্য দিতে পারছি? আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম তো সকলের জন্য ছিল, শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য নয়। তবে কেন আজ আমরা পারছি না সেই মূল্যায়নকে সমানভাবে বজায় রাখতে?

সবশেষে একটা প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, আমরা কি না চাইলেও এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি যেখানে সংখ্যালঘু হওয়া একটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে? সমাজে যদি ধর্মীয়, জাতিগত বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য না থাকে তবে সেটি কেমন সমাজ হবে? মনে রাখতে হবে, সমাজের রূপকথা তখনই সত্যি হয় যখন সেখানে সকলের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়, সকলের অস্তিত্বকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে, সেই সংখ্যার পেছনের মানবিক গল্পগুলোকে উপলব্ধি করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তবেই আমাদের সমাজ হবে প্রকৃত অর্থে মানবিক সমাজ, যেখানে কেউ নিগৃহীত হবে না তার পরিচয় বা বিশ্বাসের কারণে।

By rimjhim