বন্ধুরা, আজকের আড্ডায় আমরা একটু অন্যরকম বিষয়ে কথা বলব। আমরা সবাই জানি, ২০২০ এবং ২০২১ সাল আমাদের জীবনকে এক নতুন মোড়কে বাঁধিয়ে দিয়েছে। এমন একটা সময় আমরা পার করেছি, যা আমাদের জীবনের অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে। মহামারি, মব-হিংসা আর রাষ্ট্রীয় অস্বীকার এই তিনটি বিষয় নিয়ে আজকে আমাদের আড্ডা। মনে আছে কি, সেই দিনগুলোর কথা? চায়ের কাপে চুমুক দিলেই যেন মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা।
২০২০ সালের শুরুতেই আমাদের জীবনে এক অদেখা শত্রুর আবির্ভাব ঘটে। হ্যাঁ, আমি করোনাভাইরাসের কথাই বলছি। এই ভাইরাস শুধু আমাদের শরীরকেই নয়, মনকেও আক্রান্ত করেছে। এই মহামারি আমাদের একান্ত আপনজনদের কেড়ে নিয়েছে, আবার অনেকের জীবনে এনে দিয়েছে কঠিন একাকীত্ব। আমরা দেখেছি কিভাবে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে, কিভাবে অক্সিজেনের অভাবে মানুষ ছটফট করেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আর আমাদের সবার মনেই একটি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
মহামারির পাশাপাশি সমাজের আরেকটি অন্ধকার দিক সামনে আসে মব-হিংসার মাধ্যমে। আমরা জানি, মব-হিংসা আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। তবে এই মহামারির সময়ে এটি যেন আরও বেড়ে গিয়েছে। মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা এবং ক্ষোভ মিলে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা সত্যিই চিন্তাজনক। গণপিটুনি বা মব-লিঞ্চিং আমরা বিভিন্ন মিডিয়ায় যতবারই না দেখি না কেন, সেই ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়। এমনও হয়েছে, যেখানে মানুষ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর ভরসা না করে নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠেছে। এটি একটি ভয়ানক প্রবণতা, যা আমাদের সমাজকে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
এখন আসি রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের প্রসঙ্গে। মহামারির সময়ে বিভিন্ন দেশ তাদের দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আমাদের দেশেও অনেক সময় আমরা সরকারি পরিসংখ্যান এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করেছি। যখন জনগণ জানতে পায় যে তাদের সামনে যে তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়, তখন তাদের মনে এক ধরনের অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। আর এই অবিশ্বাস সমাজে অস্থিরতা এবং বিভ্রান্তি তৈরি করে।
এই দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। প্রথমত, মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে স্বাস্থ্যসেবা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যখাতের যে অভাব-অভিযোগ তা এই সময়ে আরও বেশি করে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্যখাতের মৌলিক সমস্যা সমাধান করা জরুরি, না হলে ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিস্থিতির মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, মব-হিংসা রোধ করার জন্য আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও দক্ষ এবং কার্যকর হতে হবে। জনগণের নিরাপত্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আমাদের কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং জনগণকে বুঝাতে হবে যে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়া কোনো সমাধান নয়।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের জায়গায় আমাদের আরও স্বচ্ছ এবং দায়িত্বশীল হতে হবে। জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর এটি না হলে জনগণের আস্থা হারিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম এবং সরকারি স্তরে আরও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।
এই দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জন্যই ছিল একটি বড় শিক্ষা। আমরা হয়তো এই মহামারির আতঙ্ক কাটিয়ে উঠেছি, কিন্ত আমাদের সচেতন হতে হবে যেন ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটে গেলে আমরা আরও বেশি প্রস্তুত থাকি। মব-হিংসা এবং রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের বিরুদ্ধে আমাদের কথা বলতে হবে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
তাই বন্ধুরা, আমরা কি শিখলাম এই দুই বছরে? আমাদের কি কেবল মহামারির ভয়াবহতা আর মব-হিংসার আতঙ্ক নিয়ে বসে থাকা উচিত, নাকি আমাদের এগিয়ে এসে সব কিছু ঠিক করার চেষ্টা করা উচিত? রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠস্বর কি আরও জোরালো করে তোলা উচিত নয়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমরা হয়তো নতুন করে ভাবতে শিখব, আর একটি নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাব। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবি, হয়তো আমরাই পারব আমাদের সমাজকে আরও সুন্দর করতে, কি বলো তোমরা?
