আমি নাস্তিক এবং একজন বাইসেক্সুয়াল। ধর্ম আমি মানি না। কিন্তু ধর্মকে যারা মানে তাদেরকে গালাগালি করি না। ধর্মের এই কাস্টসিস্টেম এবং জন্মগত ভাবে এক নম শূদ্র পরিবারে জন্ম নেয়ার কারনে যে অসহনীয় লাঞ্ছনা আর নিপীড়ন সহ্য করেছি জীবনে, সেইঅভিজ্ঞতা থেকে যখন ধর্মের কারনে নির্দোষ মানুষের উপর অত্যাচার আর নিপীড়ন হলে সেই অসহনীয় যন্ত্রণা আমি খুব ভালো করেইঅনুভব করতে পারি।মানসিক নিপীড়ন আর নিতে পারি না। মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে গেছি। রাতে ঘুম আসে না। মনে হয় দিপু চন্দ্রদাসের মতো আমাকেও এই ধর্মীয় মৌলবাদীরা জীবন্ত পুড়িয়ে মারবে না হলে গলা কেটে মারবে। যখন ভাবি, দিপুকে যখন এই মৌলবাদীরা গণধোলাই দিচ্ছিল মিথ্যা অভিযোগে, সে বাঁচার জন্য যেভাবে  আকুতি আর মিনতি করেছিলো, সেই ধর্মীয় কসাইরা দিপুর  আওয়াজ কি শুনতে পেয়েছিল? ওরা পাইনি। যখন দিপুকে মেরে রক্তাক্ত করে তার জীবন্ত দেহটায় আগুন লাগিয়ে দেয়, দিপু বাঁচার জন্যকত ছটফট করেছিলো, গায়ে আগুন লাগানোর পর যখন দিপুর শরীর নড়ে উঠেছিলো, হাত পা ছোড়াছুড়ি করছিলো সেই ভিডিও ফুটেজদেখে রাতে আর ঘুমাতে পারি না। মনে হয় আমার জীবন্ত শরীরে কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, আর আমি দিপুর মতো চিৎকার করছি।এর পর থেকে দিপু প্রায় আমার স্বপ্নে আসে আমাকে বলে তুমি আমার মৃত্যুর কথা লিখবে না? আমাকে অন্যায় ভাবে পুড়িয়ে মেরেছে,আমার হত্যার বিচার চাইবে না? আমার শরীর আগুনে পুড়ে গেছে। পোড়া  শরীরে মাংসের গন্ধ আমি সহ্য করতে পারি না। এ একবীভৎস পোড়া গন্ধ। অনেক যন্ত্রণা দিয়ে মেরেছে ওরা। তুমি আমার মৃত্যুর বিচার চাইবে না? ওরা শাস্তি পাবে না?

 দিপুর পোড়া শরীরটা যখন আমার সাথে কথা বলে, বিশ্বাস করেন আমি ঠিক থাকতে পারি না। আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। কারন আমার বাড়িতে এই মৌলবাদী কসাইরা হামলা করে বাড়িঘর ভেঙ্গেছে, পুড়িয়েছে, কারন আমি হিন্দুর ঘরে জন্মেছি, আমি নাস্তিক। আমি দিপুর যন্ত্রণা অনুভব করি, দিপুর জ্বলেছে শরীর আর আমার জ্বলেছে আমার বসত ভিটা, আমার বাড়ি ঘর। বাংলাদেশে হিন্দুর ঘরে জন্মানো, যেন এক অভিশাপ।  দিপু আমাকে প্রতিবাদ করতে বলে, আমাকে আমার লেখা চালিয়ে যেতে বলে।  দিপু বলে, ওরাআমাদের মতো হিন্দুদের এইভাবে মারবে আমরা আর কত চুপ করে থাকবো? তুমি লেখো, আমার হত্যার বিচার চাও। আমাকে যারাপুড়িয়ে মেরেছে, ওদের শাস্তি দাও। তুমি কলম থামাইও না।  লেখা থেমে গেলে কিন্তু আমাদের মতো যারা খুন হয়ে গেছে তাদের খুনেরবিচার হবে না।

দিপুর এই কথাগুলো আমাকে ভাবায়, আমি লিখে যাই, প্রতিবাদ করে যাই। বিচার চাই, দিপুর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের। দিপুকে নিয়েলিখতে গিয়ে দেখলাম, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সংখ্যা ভয়াবহ। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টথেকে সে বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ওই সময়কালে দেশজুড়ে মোট ২,১৮৪টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতারঘটনা ঘটে। আর যে ঘটনাগুলো সামনে আসে নি নির্যাতন আর খুনের সংখ্যা আরও বেশি। ২০২৫ সালের শুরুতে জাতিসংঘেরতথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই তথ্যগুলো প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছিল।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিগত এক বছরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাবলীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মোট ঘটনাসংখ্যা ৫২২টি। এর মধ্যে রয়েছে, ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা খুন হয়েছে ৬৬ জন,  ধর্ষণ ও গণধর্ষণসহ নারীর ওপর সহিংসতার ২৮টিঘটনা, উপাসনালয়ে হামলা, মূর্তি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ৯৫টি ঘটনা। উপাসনালয়ের জমি দখল বা দখলের চেষ্টার ২১টিঘটনা, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ১০২টি ঘটনা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের৩৮টি ঘটনা, হামলা, প্রাণনাশের হুমকি ও নির্যাতনের ৪৭টি ঘটনা, তথাকথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ৩৬ জনকে নির্যাতন ওগ্রেপ্তার। বাড়ি, জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক দখলের ৬৬টি ঘটনা, এবং অন্যান্য ২৯টি ঘটনা।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা প্রসঙ্গে মাননীয় মুখ্য উপদেষ্টা গত ১৯ জানুয়ারি একটি ফেসবুক পোস্টে জানান যে, দেশব্যাপীতদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে ২০২৫ সালে মোট ৬৪৫টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়াগেছে। বাকি ৫৭৪টি ঘটনাকে অসাম্প্রদায়িক বলে দাবি করা হয়েছে। পোস্টটিতে আরও বলা হয় যে, ৭১টি সাম্প্রদায়িক ঘটনার মধ্যে৩৮টি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা, ১টি মন্দিরে চুরির ঘটনা, ৮টি মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা এবং ২৩টি হুমকি সংক্রান্ত ঘটনা রয়েছে।

মূর্তি ভাঙচুর, উপাসনালয়ের প্রাঙ্গণে ক্ষতিসাধন, ফেসবুক পোস্ট এবং ১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে,সাম্প্রদায়িক উপাদানবিহীন বলে দাবি করা ৫৭৪টি ঘটনার মধ্যে ৫১টি ছিল প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাদ, ২৩টি জমি সংক্রান্ত বিবাদ, ১০৬টিচুরি, ২৬টি পূর্বশত্রুতা থেকে উদ্ভূত ঘটনা, ৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা, ১৭২টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা এবং বাকি ১৩৮টি ঘটনা অন্যান্যকারণে ঘটেছে।বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর অত্যাচারের  পূর্ণ তথ্য এই অন্তর্বর্তী সরকার কোনোদিন স্বীকার করেনি। অসত্যঘটনা, মিডিয়া কন্ট্রোল, এবং দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতেই এই অনাচার এবং তথ্য গোপন।

মুখ্য উপদেষ্টার পোস্টে ৭১টি সাম্প্রদায়িক ঘটনার তালিকা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মন্দির এবং উপাসনালয়ের প্রাঙ্গণে ঘটা ঘটনাগুলোছাড়া অন্য কোনো ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক প্রকৃতির বলে বিবেচনা করা হয়নি। এমনকি সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ১৭৩টিমৃত্যুর মধ্যেও মাত্র ১টিকে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, বাকি ১৭২টিকে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করাহয়েছে।

আরও উল্লেখ্য যে, গত বছরের বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে যেমন, সাতক্ষীর আশাশুনিতে অনিমেশ সরকারকে হত্যা করেগাছে ঝুলিয়ে দেওয়া, নাটোরের লালপুরে সুকুমার নামে এক ভ্যানচালককে গলা কেটে হত্যা, সাভারের আশুলিয়ায় স্ত্রীর সামনে স্বর্ণব্যবসায়ী দিলীপ দাসকে কুপিয়ে হত্যা, গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় পিয়াস মজুমদারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা, দিনাজপুরের বিরালেভবেশ চন্দ্র রায়কে পিটিয়ে হত্যা, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সুব্রত দাসকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে আদিবাসী যুবকশুভ সোরেনকে নৃশংসভাবে হত্যা, ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে দীপুচন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়েনির্মমভাবে হত্যা এবং বজেন্দ্র বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা, ফরিদপুরের সালথায় মাছ ব্যবসায়ী উৎপল সরকারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড,নরসিংদীতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রান্তোষ সরকারের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু, রাজবাড়ীর পাংশায় অমৃত মণ্ডলের গণপিটুনিতে মৃত্যু, রংপুরেরতারাগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা যোগেশচন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়ের গলা কেটে হত্যাকাণ্ড, চট্টগ্রামের রাওজানে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করেপাঁচটি হিন্দু ও বৌদ্ধ বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া, এবং পিরোজপুর সদরে পাঁচটি হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা, এগুলো কিসাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নয়? এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ইতোমধ্যেই সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড হিসেবেচিহ্নিত করেছে এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে এই ঘটনাগুলো নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস কি ‘সাম্প্রদায়িকতা’কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িতকরতে চান, এই প্রস্তাবনার মাধ্যমে যে, শুধুমাত্র মন্দির বা উপাসনালয়ের প্রাঙ্গণে সংঘটিত সহিংসতা ব্যতীত সমাজ ও রাষ্ট্রে সংঘটিতঅন্য কোনো ঘটনাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত নয়? বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা ভালো নেই। কেউ নিরাপদে নেই। কসাইয়ের মতোধরে জবাই করে এই মৌলবাদী কসাই মুসলিমরা। এরা বাংলাদেশে ইসলামের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আমরা এদের কাছে কাফের,মুরতাদ, তাই আমাদেরকে হত্যা করা জায়েজ। এভাবেই ইসলামের নামে কাফের নিধন চলে বাংলাদেশে। সংখ্যালঘুরা নিরাপদে নেইবাংলাদেশে।

উপরে উল্লিখিত ১৭৩টি মৃত্যুর মধ্যে সরকার মাত্র ১টি হত্যাকাণ্ডকে ‘সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমনকি এই সময়ে৫৮ জন হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এবং এই ঘটনাগুলোকেও সরকার অসাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আমিসাম্প্রদায়িকতার এমন অযৌক্তিক সংজ্ঞার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।এদের বিচার চাই। সকলকে আইনের আওতায় এনে বিচারকরতে হবে।

বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে অস্বীকার করে আসছে এবং সময়ে সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকউভয় সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অযৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা’র বিষয়টি ভিন্ন দিকে মোড় ঘোরানোর চেষ্টাকরেছে। তবে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেজনগণকে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছে।

আন্তর্জাতিক হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন ইসকনকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়ায় চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অবস্থিত পুণ্ডরিক ধামের অধ্যক্ষ প্রভুচিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও হত্যাসহ একাধিক মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং এর মধ্যে বেশ কয়েকটিমামলার প্রহসনমূলক বিচারও ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কিছু নির্দিষ্ট মহল থেকে ইসকনকে নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে।

ইস্লামতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এই মৌলবাদীরা নরপশুতে পরিণত হয়েছে। মানবতা মরে গেছে এদের জন্য। এই সরকার এক পাষণ্ড, বর্বর আরইসলামপন্থী মৌলবাদী সরকার। এই দেশ থেকে ইস্লামতন্ত্র চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। সবার আগে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাতিল করতেহবে। রাষ্ট্রের কেন ধর্ম থাকবে? রাষ্ট্রের কি প্রাণ আছে? বাংলাদেশের রাষ্ট্রের ইসলাম  ধর্ম থাকা মানেই, ইসলাম ধর্ম মতে এটা তো শিরক।এক মাত্র আল্লাহ্‌ ছাড়া কারো ইবাদত করা যায় না। তাহলে রাষ্ট্র কিভাবে ইবাদত করবে আল্লাহ্‌র? রাষ্ট্রের কি প্রাণ আছে? রাষ্ট্র কি নামাজরোজা রাখে? রাষ্ট্রের কি মৃত্যু হবে? তাহলে ইসলামের মৌলবাদী নেতারা কিভাবে রাষ্ট্রের ধর্ম নির্ধারণ করে?  মৌলবাদীরা ইসলামধর্মটাকেই শিরক বানিয়ে ফেলেছে। রাষ্ট্রের ধর্ম থাকা মানেই এটা শিরক। ইসলামে শিরক একটি গুরুতর পাপ, যাকে প্রায়ই ‘মূর্তিপূজা’ বা’বহুদেববাদ’ বলে অনুবাদ করা হয়। এরা ক্ষমতার লোভে ধর্মকেই রাজনীতি বানিয়ে দিয়েছে। আর এই ক্ষমতার লোভেই অবাধে চলেহিন্দু নিধন।এই মৌলবাদী নেতারাই হল ইবলিশ শয়তান।