শীতের সকালে চা’র কাপে চুমুক দিতে দিতে কত কথা মনে পড়ে। আমাদের জনজীবনে প্রতিদিন কত কিছু ঘটে যাচ্ছে, আর আমরা সেগুলো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। ২০২০ সালটা যেন এক নতুন যাত্রার সূচনা করেছিল, একদিকে আমরা যখন নতুন বছরের আগমনে খুশি, অন্যদিকে মনের একটা কোণে চিন্তা-কুঞ্চন ছিল। আর সেই চিন্তাজাগানো বছরটার শুরুতেই এলো বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের খবর, যার নাম করোনা ভাইরাস। কিন্তু এটাই কি সব ছিল? না, এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরো গভীর একটি সংকট, যার কথা আমরা অনেকেই জানি না বা জানলেও অনেকে অবহেলা করেছি। সেটি হলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, যা মারাত্মকভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নতুন কিছু নয়। আমাদের মতো একটি দেশে যেখানে বিভিন্ন ধর্ম এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধন রয়েছে, সেখানে সংখ্যালঘুদের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতন বেশ উদ্বেগজনক। ২০২০ সালের প্রথম দিকেই আমরা দেখতে পাই যে কিছু অসাধু চক্র এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। যখন সারা বিশ্ব করোনা মোকাবেলায় ব্যস্ত, তখন এদের সুযোগ বুঝে আক্রমণ বাড়িয়ে চলেছিল। মার্চ মাসে যখন করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে, তখন আমরা দেখতে পাই যে অনেক জায়গায় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় ও সম্পত্তির ওপর হামলা হচ্ছে। এগুলো শুধু সম্পত্তির ক্ষতি নয়, বরং মানুষের মানসিক সন্তুষ্টির ওপরও আঘাত।
এই ঘটনাগুলো যখন ঘটে, তখন মিডিয়া অনেকটাই করোনার খবর নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের দেশের অনেক সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন তখন এই সংকট নিয়ে বেশি হৈচৈ করছিলেন, যা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এর পাশাপাশি এ ধরনের সহিংসতাও যে একটি বড় সংকট, তা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। আর এর ফলে সংখ্যালঘুরাও একধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেছিল।
আমার মনে আছে, ঐসময় আমার পরিচিত এক বন্ধু, যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিল, আমাকে ফোন করে বলেছিল, সে কতটা চিন্তিত এবং আতঙ্কিত। তার কথায় ছিল একধরনের হতাশা এবং বিরক্তি। সে বলেছিল, ভাই, আমরা তো সবসময়ই এমন একটা ভয়ে ভুগছি যে কখন না কখন কোথা থেকে কোন বিপদ আসে। তার কথাগুলো শুনে আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। আমরা যে কোথায় বাস করছি, যেখানে মানুষ তার ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে নিরাপদে থাকতে পারবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
আমরা যখন করোনা মোকাবেলার জন্য নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম, তখন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমরা সেই দিকটিতে অনেকটাই পিছিয়ে। কারণ, আমাদের সমাজে এখনও এমন একটি মানসিকতা বিদ্যমান, যা সংখ্যালঘুদের প্রতি অবহেলা এবং অবজ্ঞার ভাব ফুটিয়ে তোলে।
এই ঘটনার পেছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তা হলো রাজনৈতিক অভিসন্ধি। কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। এদের জন্য ধর্মীয় সংকীর্ণতা একটি বড় হাতিয়ার। ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তারা সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায় আর এই সুযোগে তারা নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যস্ত হয়ে যায়।
তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখনও এই ধরনের সংকীর্ণতাকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এখনও আমাদের মাঝে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা এ ধরনের সংকটের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত। আমরা যে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের একসঙ্গে থাকার কথা বলি, সেই চেতনাকে নতুন করে প্রাণবন্ত করতে হবে। সকল সংকীর্ণতা এবং বৈষম্যকে দূর করে আমাদের একতাবদ্ধ হতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এ ধরনের সংকট থেকে শিক্ষা নিয়েছি? ভবিষ্যতে কি আমরা এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারবো? আমাদের কি উচিত নয় এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে সকলে নিরাপদে বাস করতে পারবে? সমাধানের পথ তো আমাদের হাতেই আছে। শুধু দরকার ইচ্ছাশক্তি আর মানবিক মানসিকতা।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজের যেখানে ধর্ম-বর্ণ যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু মানবিকতা সবার শীর্ষে। এই সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শুধু মহামারী নয়, আমাদের মানবিক সংকটও মোকাবেলা করতে হবে। আর এ জন্য আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের কেবল অন্যের অভিযোগ নয়, নিজেদের দায়বদ্ধতার কথাও মনে রাখতে হবে।
তাহলে, আপনারা কি মনে করেন? আমরা কি সেই সমাজ গড়তে পারবো যেখানে সবাই নিরাপদে এবং সুখে বসবাস করতে পারবে?
