জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনগুলোতে আমাদের দেশে সংবাদপত্রের শিরোনাম খুললেই যেন একটা পুরোনো স্ক্রিপ্টে ফিরে যাই। জমি দখল, ঘর ভাঙা, মন্দিরে ঢুকে ভাঙচুর এগুলো যেন আমাদের সমাজের এক অনিবার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন বারবার এই ঘটনাগুলো ঘটছে? এ কি শুধুই সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিফলন, নাকি এর পিছনে কোনো গোপন উদ্দেশ্য কাজ করছে?
আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। বাংলাদেশের ভূমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। মানুষের জীবনে জমির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এটা শুধু অর্থনীতির ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও একইরকম প্রভাব ফেলে। জমি মানে ক্ষমতা এবং এই ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণেই জমি সংক্রান্ত বিরোধ এত তীব্র হয়ে ওঠে। তবে সমস্যা তখনই গাঢ় হয়, যখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, জমি দখলের পেছনে রাজনৈতিক যোগসাজশ রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা এ ধরনের কাজে মদদ দেয়। তারা জানে, আইনী ব্যবস্থা অনেক সময় তাদের নাগালের বাইরে থাকে। তাই তারা নির্ভয়ে এ ধরনের অপরাধে লিপ্ত হয়। আর ভুক্তভোগীরা অধিকাংশ সময় হয়তো আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে বা রাজনৈতিক চাপের কারণে ন্যায় বিচার পায় না।
ঘর ভাঙা এবং মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের কুৎসিত মুখ তুলে ধরে। আমাদের সমাজের একটি অংশ এখনো এই ভেদাভেদের বিষয়ে অন্ধকারে বসবাস করছে। অনেক সময় স্থানীয় সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্ব বা শত্রুতার প্রতিফলন হিসেবেও এসব হামলা ঘটে থাকে। কিন্তু এর পিছনে যে একটি গভীর সামাজিক সমস্যা লুকিয়ে আছে সেটা আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না। ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে অনেকে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির চেষ্টা করে।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার, এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য আমাদের আইন এবং বিচার ব্যবস্থার শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আমাদের নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে।
আরেকটি দিক হলো, আমাদের মিডিয়ার ভূমিকা। মিডিয়া যেন শুধুমাত্র খবর প্রচারে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং এসব ঘটনার গভীরে গিয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে সমাজকে জানাতে পারে। মিডিয়ার একটি সঠিক প্রত্যক্ষীকরণের মাধ্যমে সমাজের প্রবেশযোগ্য অংশকে সচেতন করা সম্ভব।
এছাড়া, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন একটা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিকতা ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেবে। সমাজে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা এবং ভীতিও সৃষ্টি করা জরুরি।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা নিজেরা এই বিষয়গুলোতে কতটা সচেতন। আমরা কি শুধু হাত গুটিয়ে বসে থাকবো, নাকি সক্রিয়ভাবে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলব? আমরা নিজেদের মধ্যে সংহতি গড়তে পারলে আশা করি এই ধরনের অপরাধ কমে আসবে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, তবে কি এই সমস্যার কোনো সমাধান নেই? আমি বলব, সমাধান আছে, তবে তার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ এবং সদিচ্ছা। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে, নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে।
অতএব, এই নতুন বছরে আমরা কি শুধুমাত্র পুরোনো স্ক্রিপ্ট পড়তে থাকবো, নাকি নতুন এক অধ্যায় শুরু করতে পারবো যেখানে জমি দখল, ঘর ভাঙা, মন্দিরে ভাঙচুরের মতো ঘটনাগুলোকে অতীতের অংশ হিসেবে ভাসিয়ে দিতে পারবো? সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আমাদের হাতে। প্রত্যেকটি পরিবর্তন আমাদের নিজেদের মধ্যেই শুরু করতে হবে। সমাজের এই চক্রভঙ্গ থেকে মুক্ত হতে হলে, আমাদের প্রত্যেকের উচিত মনের দেয়াল ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আশা করি, এই নতুন বছর আমাদেরকে সেই সাহস এবং প্রেরণা এনে দেবে।
