ফেসবুক পোস্ট থেকে থানায় মামলা, তারপর গ্রামে বয়কট এই ঘটনা শুনে কি আপনারা অবাক হচ্ছেন? আশ্চর্য হবার কিছু নেই, কারণ আমাদের দেশেই তো এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। ডিজিটাল যুগে আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি, কিন্তু সেই পাওয়ার সাথে বাড়ছে নিত্যনতুন সমস্যাও। ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা যে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই স্বাধীনতা ব্যবহারে আমরা অনেক সময়ই সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছি। আর তার ফল যা হতে পারে, তা হয়তো কল্পনাতেও নেই অনেকের।
আচ্ছা, আপনারা কি জানেন, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এমন এক ঘটনা ঘটেছিল যা সামাজিক মাধ্যমের ভুল ব্যবহারের একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? ঘটনাটি এক গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। গ্রামের একজন যুবক, নাম বলি রাশেদ, সে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিল। পোস্টটি ছিল তার গ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। খুবই সাধারণ একটি পোস্ট, যেখানে সে উল্লেখ করেছিল গ্রামে কিছু নেতার দুর্নীতি প্রসঙ্গ। তার এই পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়, এবং তা গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চোখেও পড়ে।
রাশেদের পোস্টটি পড়ে গ্রামবাসী মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। কেউ কেউ তার সাহসের প্রশংসা করলেও, অধিকাংশই ক্ষুব্ধ হয়। গ্রামের কিছু ব্যক্তি থানায় গিয়ে রাশেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় থানায়। বুঝুন অবস্থা, ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য থানায় যাওয়া!
এবার ঘটনাটির দ্বিতীয় অংশে আসি। থানা থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যেই অবশ্য রাশেদ ছাড়া পায়। কিন্তু ততক্ষণে গ্রামে তার বিরুদ্ধে বয়কটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে গেছে। গ্রামের হেডম্যান বা মাতব্বর রাশেদের বিরুদ্ধে মানুষকে উস্কে দিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেয় যে রাশেদকে গ্রামের কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না। তার সাথে কেউ মিশবে না, তার দোকানে কেউ কিছু কিনবে না, এমনকি তার পরিবারের সাথে সামাজিক সম্পর্কও রাখা হবে না। এই গ্রামীণ সমাজে বয়কটের শাস্তি কতটা কঠিন হতে পারে, তা আমরা যারা শহুরে জীবনযাপন করি তারা হয়তো অনুভব করতে পারি না। কিন্তু গ্রামে সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। রাশেদের পরিবার পুরোপুরি একঘরে হয়ে পড়ে।
অতঃপর, এ ঘটনা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমেই অনেকে রাশেদের পক্ষে দাঁড়ায়। প্রশ্ন করা হয়, ফেসবুকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি তাহলে নেই? কেন এমন একটি ঘটনায় থানায় মামলা করতে হবে? কেন কাউকে বয়কট করতে হবে?
আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আজকের যুগে ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু সেগুলোর ব্যবহার জনমনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে অনেকেরই সচেতনতা নেই। আমরা প্রায়শই দেখছি, ছোট্ট এক পোস্টের জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। এমনকি গ্রেপ্তার পর্যন্ত হতে হচ্ছে। এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে ডিজিটাল মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কোথায় থামবে?
আমার মতে, এই ধরনের ঘটনা একটি সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। আমরা সামাজিক মাধ্যমকে শুধু আপডেট শেয়ার করার জন্য নয়, বরং অনেক সময় আমাদের অসন্তোষ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করছি। কিন্তু আমরা কি আদৌ বুঝতে পারি, এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে? আমাদের সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, তার সীমারেখা আমাদের প্রতিটি নাগরিকের জানা প্রয়োজন। ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে কোন তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়ে একজন সচেতন নাগরিকের সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।
এই ঘটনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহারের পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি। আমরা ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমে কোনো কিছু পোস্ট করার আগে তার ফলাফল চিন্তা করা উচিত। আমাদের উচিত বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নেয়া, যাতে সমাজে অশান্তি না সৃষ্টি হয়।
ফেসবুক পোস্ট থেকে থানায় মামলা, তারপর গ্রামে বয়কট এই ঘটনার পর আমরা কি সঠিক শিক্ষা নিতে পারি না? আমাদের উচিত শিক্ষা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি শুধু ফেসবুকে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় মত্ত থাকব, নাকি তার যথাযথ ব্যবহার শিখবি? মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন আমাদের অধিকার, তেমনি তার দায়িত্বও আমাদের ওপর বর্তায়। আপনারা কী বলেন?
