বৌদ্ধ বিহার এবং চার্চে ভয় দেখানোর ঘটনাগুলি শুনলে আমার মনের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি বয়ে যায়। এসব ঘটনা যখন গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে, তখন বুঝতে পারি যে, আমাদের সমাজের মধ্যে এখনো কতগুলো ক্ষত কাজ করছে। চারপাশের মানুষদের মধ্যে সহমর্মিতা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা কতটা জরুরি, এই ঘটনা আমাদের বারবার সেটাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমাদের দেশের সংবিধান অনুযায়ী, ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। অথচ, কিছু কুচক্রী মহল এই অধিকারগুলিকে হরণ করতে চায়। তারা ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করে। বিশেষ করে, যখন আমরা দেখি বৌদ্ধ বিহার বা চার্চের মতো পবিত্র স্থানগুলোতে ভয় দেখানো হয়, তখন তা শুধু ঐ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য নয়, আমাদের সামগ্রিক সমাজের জন্যও হুমকিস্বরূপ।
আমি মনে করি, এসব ভয় দেখানোর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করে। প্রথমত, কিছু রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের মধ্যে ভয় এবং বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অসহিষ্ণুতার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। তা শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবের ফল।
আমি একবার চট্টগ্রামের এক বৌদ্ধ বিহারে গিয়েছিলাম। সেখানকার শান্ত পরিবেশ, ভক্তদের আন্তরিকতা এবং ধর্মগ্রন্থের পাঠ শুনে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু যখন শুনি ওই বিহারে ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটেছে, তখন মনে হয়, মানুষের হৃদয়ে যদি শান্তির বার্তা পৌঁছাতে না পারে, তাহলে এই ধরনের ক্রোধময় এবং ভীতিকর কাজ আরও বাড়বে।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কথা বলি, তাদের চার্চগুলিও প্রায়ই আক্রমণের মুখে পড়ে। আমার এক বন্ধু, যার পরিবার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, সে প্রায়ই বলে, তার পরিবার নিয়মিত ভয়ে বসবাস করে। চার্চে যাওয়া মানেই একটা ঝুঁকি নেওয়া। অথচ চার্চের পরিবেশ, গান এবং প্রার্থনা মানুষের মনে কতটা শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়, তা না গেলে বোঝা যায় না।
বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা, সহিষ্ণুতা এবং সম্মানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। স্কুল স্তর থেকে এই সচেতনতার শুরু করা উচিত। ছোটবেলা থেকেই যদি আমরা বিভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান দেখানো শিখি, তাহলে বড় হয়ে এসব বিরোধ, ভয় এবং আক্রমণের ঘটনা কমে আসবে।
একটি কথা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ধর্ম কোনদিনই ভয় দেখানো বা মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার জন্য নয়। ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবিকতা এবং শান্তির বার্তা প্রচার করা। যে কোনো ধর্মের মহৎ ব্যক্তিরা সব সময় মানুষের মধ্যে ভালবাসা এবং সহমর্মিতা গড়ে তুলতে কাজ করেছেন।
আজকের সমাজে আমরা যদি একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাই, তাহলে যে কুচক্রী মহল আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চায়, তারা কখনো সফল হবে না। আমাদের একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে হবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ, আমরা ভয় পাই না।
সম্প্রতি ধর্মীয় স্থানগুলিতে এই ভয় দেখানোর ঘটনাগুলির প্রেক্ষাপটে আমাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আমরা কি পারি না, আমাদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং সমাজের বিবেকবান ব্যক্তিদের একত্রিত করে এই সমস্যা সমাধানে কাজ করতে? তারা যদি সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়, তাহলে ভীতি এবং বৈষম্যের এই অন্ধকার থেকে আমাদের সমাজ মুক্তি পেতে পারে।
সর্বশেষে, এই ঘটনাগুলির বিষয়ে আমাদের শক্ত অবস্থান নিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সরকারের উচিত এসব ঘটনার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, ধর্মীয় ভয় দেখানোর কোন স্থান নেই আমাদের সমাজে।
আপনি কী মনে করেন? আমাদের সমাজে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা গড়ে তোলার জন্য আর কি কি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে? আপনার মতামত জানাতে কমেন্টে লিখুন, কারণ পরিবর্তন আনার জন্য আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে।
