২০২০ সালে যখন কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক পরিবর্তন আনল। কিন্তু মহামারির আগে থেকেই সমাজে লুকানো বিভিন্ন সমস্যাগুলো তখন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে, ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের ঘটনাগুলো যেন নতুন করে মাথা চাড়া দিতে শুরু করল। আমাদের আলোচিত শিরোনামটি সেই বৈষম্যেরই একটি উদাহরণ। আসুন, আমরা একটু সময় নিয়ে এই বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনা করি এবং দেখি, কিভাবে এই বৈষম্য বাংলাদেশের মতো দেশেও প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হলেও, এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্য ও প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতিদিনের জীবনে যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা এক কথায় বলা যায় না। এই মহামারির সময় সেই বৈষম্য নতুন রূপে দেখা দেয়, যখন সংখ্যালঘুদের দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি বন্ধ করে দেওয়া হয়, অথচ মুসলিম ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজন হলে দোকান খোলা রাখার অনুমতি ছিল। এটা যে কতটা অন্যায়, তা তো আমরা সকলেই বুঝি। তবে কি মহামারির মধ্যে আমরা আরও সমানাধিকারের চর্চা করতে পারতাম না?

আমরা যদি এই বৈষম্যের পেছনের কারণ খুঁজে দেখি, প্রথমে আমাদের সমাজের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করতে হবে। আমাদের সমাজে ধর্মীয় এবং জাতিগত পরিচয় এখনো অনেক সময় মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে। ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি অবহেলা বা বৈষম্য যেন একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মহামারি আমাদের শিখিয়েছে যে, এই ধরনের সংকটকালে সবাই মিলে কাজ করলেই কেবল আমরা সাফল্য অর্জন করতে পারি।

তবে এই বৈষম্যের আরেকটি কারণ হতে পারে ক্ষমতার অপব্যবহার। স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজপতিরা অনেক সময় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই ধরনের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। মুসলিম ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার পেছনে তাদের ব্যবসায়িক প্রভাব এবং সামাজিক অবস্থান একটি বড় ভূমিকা পালন করে। অথচ সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এমন কোনো সুবিধা নেই, ফলস্বরূপ তাদেরকে এ ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হয়।

যদিও সরাসরি পরিসংখ্যান পাওয়া সম্ভব নয়, তবে বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, মহামারির সময় মানুষের মধ্যে বৈষম্য এবং ভেদাভেদ আরও বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘুদের দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে মুসলিম ব্যবসায়ীরা সেই সময়ে কিছুটা হলেও ব্যবসা চালিয়ে যেতে পেরেছেন। এই ধরনের বৈষম্য আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকটাকে আরও উন্মোচিত করেছে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে আমরা সবাই কমবেশি জানি। সমাজের বিভিন্ন স্তরে তারা বৈষম্যের শিকার হন। কিন্তু মহামারির সময় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দোকানপাট বন্ধ করার ক্ষেত্রে এই বৈষম্য যেন সেই পরিস্থিতিরই একটি চিত্র তুলে ধরে। এটা আমাদের জন্য একটা বড় চিন্তার বিষয় যে, আমরা কি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতেই থাকবো, নাকি সবাইকে সমানভাবে দেখার চেষ্টা করবো?

মহামারি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। তবে সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সমানাধিকার এবং সহমর্মিতা। আমরা যদি আমাদের সমাজকে একটি সুন্দর ও সুরক্ষিত জায়গা হিসেবে দেখতে চাই, তবে এই ধরনের বৈষম্য থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। আমাদের প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

যদিও বিষয়টি শিরোনামের মতোই অনেককে হতবাক করে দিয়েছে, তবুও এটি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। এই ধরনের বৈষম্য সমাজের জন্য একটি বড় ক্ষতি, যা আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দূর করতে হবে। মহামারির সময় আমরা যে শিক্ষাগুলো পেয়েছি, সেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করতে শিখতে হবে। আসুন, আমরা সকলে মিলে একটি সমানাধিকারভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমাদের যে সংগ্রাম করতে হবে, সেই সংগ্রামের জন্য আমরা সবাই প্রস্তুত তো?

By ishita