সন্ধ্যার চা পানের সময়টা আমার কাছে সবসময় একান্ত কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়। চারদিকের কোলাহল থেকে একটু দূরে বসে চিন্তায় ডুব দেওয়ার এই সময়টাই বেছে নেই। সম্প্রতি যখন করোনাভাইরাসের প্রভাব চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন এই চিন্তাগুলো আরো গভীর হয়েছে। আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো, করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু শ্রমিকরা কেমন করে ত্রিপল ধাক্কার শিকার হচ্ছে – করোনা, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় বৈষম্য।
আপনারা যারা এই ব্লগটি পড়ছেন, তাদের অনেকেই হয়তো চাকরি হারানোর দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে যদি আপনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হন, তবে আপনার জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে দাঁড়ায়। করোনা মহামারী যখন আমাদের দেশে হাত-পা ছড়ানো শুরু করল, তখন প্রথমে শুধু একটা স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিলো, যা প্রত্যেক পরিবারের আয়-উপার্জনের উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করলো।
তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে সেসব মানুষ যারা অর্থনৈতিকভাবে তো দুর্বল এর পাশাপাশি সামাজিকভাবে সংখ্যালঘু হিসেবেও চিহ্নিত। তারা যেন দুটি দিক থেকেই আঘাতপ্রাপ্ত। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকেই অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, বাজারে ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। এসবের মধ্যে বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রমিকরা তাদের চাকরি হারিয়েছে সবচেয়ে বেশি। কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ার পরও ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে গেছে।
আমার এক বন্ধু আছে, যার নাম রমেশ। সে একটি গার্মেন্টসে কাজ করছিল। মজুরি খুব বেশি না হলেও, তার পরিবারকে নিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছিল। করোনা আসার সাথে সাথে তার গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেল। নতুন চাকরি খুঁজতে গেলে সে বুঝতে পারে যে শুধু তার কাজের দক্ষতা এখানে প্রশ্নের বিষয় না, বরং তার ধর্মও এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই সে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দিতে যায়, তখনই তাকে বিভিন্নভাবে বাইরের লোকের চোখে দেখা হয়।
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, সরকারি কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই? এর উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, আমাদের দেশে অসংখ্য সংখ্যালঘু মানুষ আছে যারা বিভিন্ন ধরনের কাজের সাথে যুক্ত। কিন্তু তাদের অনেকেই এমন এক সমাজের অংশ যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ এখনও প্রবল। ফলে সরকারি সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেই বা কী লাভ, যদি সমাজ সেই ব্যবস্থাগুলি কাজে লাগাতে না চায়।
করোনাভাইরাসের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক মন্দা এবং দারিদ্র্যের চাপ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর দ্বিগুণ হয়ে পড়েছে। এমনকি যারা ছোট ব্যবসা বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিল, তারাও তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছে না। কারণ সমাজে যারা সংখ্যাগুরু, তারা সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে পণ্য বা সেবা নিতে উৎসাহী হয় না।
এমনকি করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আঞ্চলিক সহিংসতাও বেড়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসাবাড়িতে হামলার ঘটনাও শোনা গেছে। এসবের মধ্যে তাদের মধ্যে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। তারা যে নিরাপত্তার সাথে বাস করবে, সেই নিশ্চয়তাও অনুপস্থিত। ফলে, শুধু আর্থিক সংকট না, মানসিকভাবেও তারা বিপর্যস্ত।
এর মধ্যে যদি প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার সক্রিয় ভূমিকা না নেয়, তাহলে এই বৈষম্য আরো বাড়বে। আমাদের দেশের সংবিধান সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করলেও, বাস্তবতা কিন্তু অন্য কথা বলে। ধর্মীয় বৈষম্য দূর করার জন্য নীতিগত পরিবর্তন দরকার। কিন্তু সেই পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতার বৃদ্ধি ঘটবে।
আমরা কি প্রস্তুত সংখ্যালঘুদের এই ত্রিপল ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে? একদিকে সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যদিকে আমাদেরও ব্যক্তিগতভাবে এই বৈষম্য দূর করতে এগিয়ে আসতে হবে। এতে করে আমরা একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে সবাই সমানভাবে বাঁচার অধিকার পাবে।
এই ব্লগ লেখা শেষ করতে বসে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি পারব আমাদের সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে সমান চোখে দেখতে? যদি আমরা নিজেদের পরিবর্তন করতে পারি, তবে এই ত্রিপল ধাক্কার প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব। ধন্যবাদ, চায়ের কাপ হাতে আপনারা আমার সাথে এই ভাবনা ভাগ করে নিলেন। আশা করি, আমরা এই পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করব।
