বন্ধুরা, আজ আমরা বসেছি একটা গাঢ় কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক গভীর সমস্যার কথা আলোচনা করতে। আমরা যখন দেখি যে স্কুল–কলেজ বন্ধ, তখন ভাবি শিক্ষার্থীদের সামনে এক বৃহৎ শূন্যতা নেমে এসেছে। যেন এক অদৃশ্য কাটা তাদের শিক্ষার পথে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই শূন্যতা যখন অনলাইনে বিদ্বেষের আকারে রূপ নেয়, তখন তা কেবল শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পথেই নয়, তাদের জীবনের পথেও বাধা সৃষ্টি করে। টিকটক, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এসবের মাঝে আজকের তরুণ প্রজন্ম যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আর এই হারানোর পথে সংখ্যালঘু তরুণ–তরুণীরা আরও বড় প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে।
২০২০ সালের শুরুর দিকের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই, যখন পুরো পৃথিবী হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল। স্কুল, কলেজ, অফিস সবকিছুর দরজা বন্ধ। ভাবনা ছিল যে এই পরিস্থিতিতে মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখলাম? অনলাইনে বিদ্বেষ, হেনস্থা এবং অপমানের নতুন এক জগতের সৃষ্টি হলো। টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম, যা কল্পনার অবকাশ দিতে পারতো, তা রূপ নিলো বিদ্বেষের এক মহাসমুদ্রে। আর সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, এই বিদ্বেষের শিকার হলো আমাদের সংখ্যালঘু তরুণ–তরুণীরা, যারা নিজেদের পরিচিতি এবং সম্মান নিয়ে লড়াই করে চলেছে প্রতিদিন।
অনলাইনে বিদ্বেষের শিকার হলে শুধু মানসিক আঘাতই নয়, এর ফলে অনেকের শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একবার ভাবুন, যখন একজন তরুণ-তরুণী টিকটকে লাইভে কোনো নাচ বা গান শেয়ার করছে, তখন হয়তো তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বেশি দেখা গেছে অপমান বা বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তারা যে মানসিক চাপে ভুগছে, তা অনেক সময় পরিবারের সঙ্গেও শেয়ার করতে পারে না। এই বিদ্বেষ তাদের মনে ভয় এবং অনিরাপত্তার বোধ সৃষ্টি করে, যা তাদের সৃষ্টিশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়।
আমি নিজে একজন ব্লগার হিসেবে বহুবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে অনলাইনে আপত্তিকর মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমার চারপাশের অনেক তরুণ-তরুণীও আছে, যারা শুধুমাত্র জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অপমানিত হয়েছে। আমাদের দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের ভালোভাবে দেখতে না পারার প্রবণতা বহুদিনের। কিন্তু আজ যখন আমরা আধুনিকতার কথা বলি, সেই সাথে এটাও সত্য যে আমাদের উচিত এই বিদ্বেষকে পিছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শুরু থেকেই বিনোদনের জন্য তৈরি হলেও, মানুষের অপব্যবহারে এটি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। এখানে মজার কন্টেন্টের বদলে যদি আমরা বিদ্বেষপূর্ণ কন্টেন্ট দেখতে পাই, তাহলে এর কী লাভ? আমাদের উচিত নিজেদের বিবেককে জাগিয়ে তোলা এবং বুঝতে পারা যে অনলাইন বিদ্বেষ বন্ধ করা জরুরি।
এই সমস্ত সমস্যার সমাধান কি শুধুই সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত? একদমই না। সমাজের প্রতিটি সদস্যেরই দায়িত্ব আছে এসব বিদ্বেষ বন্ধ করার। পরিবারের বড়দের উচিত তাদের সন্তানদের বোঝানো যে অনলাইনে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত। আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে সবসময় সঠিক বার্তা পৌঁছানো উচিত যে বিদ্বেষ নয়, বিনোদন এবং শিক্ষাই অনলাইনে শেয়ার করার প্রধান লক্ষ্য।
শেষে একটি কথা বলি আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি, এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব। কিন্তু আমি বলব, একটি ছোট পদক্ষেপও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমাদের উচিত একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে এই বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গঠনে কাজ করা। আজকে আমি আপনাদের প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি আপনাদের কি মনে হয় না, আমরা যদি একসাথে দাঁড়িয়ে এই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করি, তাহলে সেই দিন বেশি দূরে নেই, যেদিন আমাদের তরুণ প্রজন্ম এক নতুন এবং আশাবাদী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারবে?
