আমাদের দেশটা তো কখনোই কোর্ট-কাছারি, থানা পুলিশ, বা মিডিয়া থেকে মুক্ত নয়। এখানে মানুষ নিজের অধিকার বুঝে পেতে, নিজের সম্পদ রক্ষা করতে, নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে প্রায়শই এই সব স্থানে দৌড়ায়। যারা বাইরে যেতে চায়, ভিনদেশে আশ্রয় নিতে চায়, তাদের কথা নয় আজকের আলোচনা। আজ আমরা কথা বলবো তাদের নিয়ে, যারা নিজের দেশেই থাকতে চায়, নিজের ঘরদোর, জমিজমা নিয়ে শান্তিতে থাকতে চায়, আর তাদের জন্য কেমন কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এই প্রক্রিয়া। শিরোনাম পড়ে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এটা কোন সুখের গল্প নয়।
আমার এক বন্ধু, নাম বলবো না, সে তার পৈতৃক বাড়িতে শান্তিতে থাকতে চায়। তার বাড়ি নিয়ে অনেক কাহিনী। দাদা-দাদী, নানা-নানী থেকে শুরু করে বাবার সময় পর্যন্ত এই বাড়ি নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছে। আশপাশের লোকজন, তাদের লোভ আর ষড়যন্ত্র এই বাড়ির পিছু ছাড়ে না। বাড়ি তো থাকলো, তার আশপাশের জমি নিয়ে প্রায়ই মামলা-মোকদ্দমা লেগেই থাকে। দাদা জমি কিনেছিলেন, বাবা তার উপর বাড়ি বানিয়েছিলেন। এখন সেই বাড়িতে তার পরিবারের সদস্যরা মিলে থাকেন। কিন্তু বাড়ির শান্তি যেন কোথাও লুকিয়ে থাকে।
এত দিন ধরে কোর্টের ঘানি টানা আর থানায় দৌড়াদৌড়ি করা, এসব তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এসব চুকিয়ে হয়তো সে একদিন শান্তিতে বাড়ি ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু সত্যি বলতে, কোর্টের মামলা তো তার নিজের জীবন থেকে শেষ হয় না। থানার পুলিশের সাতে-পাঁচে জড়িয়ে পড়ে সে ক্লান্ত হয়ে যায়। সেসব বিষয়ে একদিন চায়ের কাপ হাতে গল্প করতে গিয়ে বলছিল, “ভাই, মনে হয় না এই ঝামেলা থেকে কখনো মুক্তি পাবো। কোর্টের তারিখ, থানার কনস্টেবলদের ফোন আর তাদের সাথে আপোস-মিমাংসা করা, এসবই তো জীবনের এক অংশ হয়ে গেছে।”
এটা শুধু তার গল্প নয়, এমন হাজারো মানুষ আছেন যারা নিজেদের বাড়িঘর কিংবা জমিজমা নিয়ে কোর্ট-কাছারিতে সময় কাটাচ্ছেন। তারা হয়তো কিছুদিন পর হাল ছেড়ে দিবেন, কারণ এত দীর্ঘ সময় ধরে এসব কাণ্ডে জড়িয়ে থাকতে থাকতেই তাদের জীবনের অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তবুও, এইসব মানুষ আশায় থাকে, তাদের জমিজমা, তাদের বাড়িঘর একদিন ঠিকই তাদের হবে। তারা ভাবেন, “নিজের দেশেই থাকতে চাই, নিজের ঘরেই থাকতে চাই। কিন্তু কেন জানি যেন, নিজের দেশেই পর হয়ে যাচ্ছি।”
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি কেন এমন হয়? কেন দেশে থাকতে চাইলেও আমাদের কোর্টে, থানায় দৌড়াতে হয়? কিছু লোকের লোভ আর ক্ষমতার প্রভাবে সৎ মানুষগুলো কিভাবে ভোগান্তিতে পড়ে? আর মিডিয়া? মিডিয়া তো সেই সব খবর প্রচার করে, যা তারা চায়। অনেক সময় মিডিয়ার সাহায্য নিতে গিয়ে মানুষ নিজের সমস্যা আরো খারাপ করে ফেলে। মিডিয়ার প্রচার কিংবা অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মধ্যেও থাকে পক্ষপাতিত্বের আভাস। এমন অবস্থায় কীভাবে মানুষ নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারে?
আসলে আমাদের দেশের সিস্টেমটাই এমন হয়ে গেছে, যেখানে ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষ জর্জরিত হয়ে পড়ে। জমি-ঘরের মালিকানা নিশ্চিত করতে গেলে আপনাকে এমন কিছু রাস্তা ধরে চলতে হবে, যেগুলো সহজ নয়। কোর্টের মামলাগুলো প্রায়শই বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে। প্রতিটি শুনানির মধ্যে অপেক্ষার প্রহর কাটতে থাকে, আর এদিকে জীবনের সব আনন্দ মাটি হয়ে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে কেন মানুষ শান্তিতে থাকতে পারে না, কেন নিজের ঘর-বাড়িতে নিরাপদ বোধ করতে পারে না? কেন দেশের সিস্টেম এতটা দুর্বল আর অদক্ষ যে মানুষের এভাবে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়? এ যেন এক অদ্ভুত রকমের বন্দিশালা, যেখানে আমরা নিজেদের ইচ্ছায় নিজেদের বন্দি করে ফেলি।
অবশ্যই, এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় আছে। তবে তার জন্য চাই সিস্টেমের পরিবর্তন। মানুষ সৎভাবে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিজের অধিকার বুঝে পেলে এই দেশের কোনো মানুষই অন্য দেশে যেতে চাইবে না। তবে এর জন্য চাই আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সম্মিলিত উদ্যোগ। আমাদের বোঝা দরকার, দেশের প্রতিটি নাগরিকের সন্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার রয়েছে। আমরা যদি আমাদের সিস্টেমকে পরিবর্তন করতে পারি, যদি কোর্ট-কাছারি আর থানার ভোগান্তি কমাতে পারি, তবে নিশ্চয়ই দেশের মানুষ নিজের ঘরেই থাকতে চাইবে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারি? আমাদের আপনার ঘরের গল্প, আমার বন্ধুর গল্প এই গল্পগুলো যেন অন্য কোনো মানুষের জীবনে না ঘটে, সেজন্য কি আমরা কিছু করতে পারি? প্রশ্নটা এখানেই রেখে গেলাম আপনি এবং আমিই এর উত্তর খুঁজব।
