২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসটা আমাদের জীবনে ঠিক কীভাবে এত দ্রুত পরিবর্তন এনে দিলো, তা ভাবলেই অবাক লাগে। আমাদের সমাজের প্রতিটি কোণে, গলিতে, মন্দিরের বারান্দা হয়ে উঠছে অসহায় মানুষের সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র। এই সময়টা যেন আমাদের সামনে এক নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে, যেখানে মানুষ তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সবকিছুই ত্যাগ করতে প্রস্তুত।

মহামারির প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক ভিন্নধর্মী সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট। অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, কেউ কেউ জীবনের প্রিয়জনদের হারিয়ে নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন। আর এই সবকিছু মিলিয়ে আমাদের পরিচিত সমাজের ছবিটা অনেক পাল্টেছে। এই মহামারির সময়ে মন্দিরের বারান্দাই হয়ে উঠেছে তাদের জন্য একটি নিরাপদ স্থল।

এই চিত্র শুধু আমার নিজের চোখেই দেখেছি তা কিন্তু নয়। গত মাসে ঢাকার এক মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমি একদল মানুষকে দেখতে পেলাম, যারা আসলেই খুব সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। তারা সেই মন্দিরের বারান্দায় বসে ছিলেন, কিছুজন ছোট ছোট পাত্রে খাবার রান্না করছিলেন। তাদের চোখে মুখে এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ স্পষ্ট ছিল। এমন দৃশ্য দেখে আমার নিজের মনে হলো, এই মানুষগুলো কি সত্যিই আমাদের সমাজের অংশ না কী আমরা শুধুমাত্র তাদের প্রয়োজনের সময় তাদের কথা স্মরণ করি?

আমাদের দেশে মন্দির, মসজিদ, গির্জা এসব উপাসনালয় শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য নয়, বরং অনেক সময় সমাজসেবার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। তবে এই মহামারির সময় মন্দিরগুলোর দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে গেছে। অনেক মন্দির প্রশাসন এমন উদ্যোগ নিয়েছে যেখানে তারা দুঃস্থ মানুষদের আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করছে। তবে এই সব কিছুই পাঠকদের কাছে শুধুমাত্র একটি ঘটনা হিসেবে তুলে ধরতে চাই না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর সত্যটা বুঝতে চাই।

মন্দিরের বারান্দায় থাকা এই মানুষগুলোর বেশিরভাগই দিনমজুর, ফ্রিল্যান্সার, ছোট ব্যবসায়ী অথবা এমন কেউ, যারা এই মহামারির আগে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নিরুপায় হয়ে এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রিত হয়েছেন। আপনি যদি একবার তাদের সাথে কথা বলেন, তাহলে দেখবেন কতটা নীরব সহ্য এবং সাহসের সাথে তারা এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি? আমাদের দেশটি উন্নয়নশীল, আমাদের এখানে সবকিছুই প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও মন্দিরগুলি তাদের ক্ষুদ্র উপায় দিয়ে চেষ্টা করছে এই মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করতে। তবে সমাজের অন্যান্য অংশের কি কিছুই করার নেই? আমরা কি একটু সহানুভূতি দেখাতে পারি না?

এমন সংকটময় সময়ে আমাদের সবার উচিত মানবতার পাশে দাঁড়ানো। আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে যা কিছু করা সম্ভব, তা করাই উচিত। হয়তো আপনি ভাবছেন, কী করবো আমি? আপনার যা কিছু আছে, তা দিয়েই সাহায্য করতে পারেন। হয়তো কয়েকটি খাবার, কিংবা কিছু অর্থ সহায়তা যা-ই হোক, সবই মূল্যবান। কখনো কখনো দুটি শব্দই তাদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে ‘শক্ত থাকো’, ‘আমরা তোমার পাশে আছি’।

আমাদের মনে রাখা উচিত, মন্দিরের বারান্দা হয়ে ওঠা এই সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রগুলি একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কী হবে এই মানুষগুলোর? তখন কী হয়ে উঠবে আমাদের দায়িত্ব? সরকারের দায়িত্ব তো আছেই, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের সহানুভূতি, মানবতা, এবং সচেতনতার ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা যদি চাই, তাহলে হয়তো আমরা এদের জন্য একটি নতুন ভোরের সূচনা করতে পারবো, যেখানে তারা আবারো নতুন করে জীবনের পথে পা রাখতে পারবে।

মন্দিরের বারান্দা হয়ে উঠছে সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র এই কথাটি শুধু একটি খবর নয়, বরং আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। আমাদের শেখার আছে যে এই পরিস্থিতি আমাদের সত্যিকারের মূল্যবোধ কতটা জাগ্রত করেছে। আর এই শিক্ষা আমাদেরকে ভবিষ্যতে আরও বেশি সহানুভূতিশীল মানব হিসেবে গড়ে তুলবে বলেই আমি বিশ্বাস করি। আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন যে এ ধরনের উদ্যোগ আরও প্রসারিত হওয়া উচিত? কিংবা আমরা অন্য কোন পন্থায় এই অসহায় মানুষদের আরো বেশি সহায়তা করতে পারি?