শিরোনামটি পড়ে মনে হয় যেন কানে বাজছে এক অদ্ভুত সঙ্গীত নয়তো কোনো প্রতিধ্বনি যা আমাদের সমাজের কোন এক কোণে লুকানো অসহনীয় সুর তুলে ধরছে। “দুর্গাপূজার আগেই হুমকি: ‘মাইক কমাও, আর মূর্তি কমাও’ শিরোনামটি মনে হয় এক নতুন কাহিনী নয়, বরং আমাদের সমাজের পুরনো গল্পের নবীকরণ। আমাদের দেশে সারাবছরই নানা ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়। তবে বাঙালির জীবনে দুর্গাপূজা বোধহয় এক অন্যরকম আবেগের নাম। এই পূজাকে কেন্দ্র করে যেমন উৎসবের আমেজ থাকে, তেমনই কিছু অদ্ভুত হুমকির ঘটনাও সামনে আসে, যা কোনোমতেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশের মতো ধর্ম নিরপেক্ষ দেশে সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান এবং ধর্মীয় উৎসব পালনের স্বাধীনতা থাকা উচিত। দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের জন্য নয়, বরং এটি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান পরিচায়ক। পুজোর সময় যে বাঁশের বাশির সুর, ধুনুচি নাচ, মায়ের মূর্তির পায়ে অঞ্জলি দেওয়া সব কেমন যেন একাত্ম করে ফেলে আমাদের। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই যখন আমরা শুনি ‘মাইক কমাও, মূর্তি কমাও’ এর মতো হুমকি, তখন মনে হয় যে কোথাও কিছু ভুল হচ্ছে। সমাজের কিছু মানুষ হয়তো ভুলে যাচ্ছে যে, এই উৎসবের মূলে আছে শুধুই সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি।

আমার মনে আছে, ছোটবেলায় প্রথমবার যখন দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে গিয়ে প্রতিমা দেখেছিলাম, সেই অভিজ্ঞতা যেন এখনও মনে দাগ কেটে বসে আছে। চোখের সামনে বড় বড় প্রতিমাগুলো দেখে মনে হয়েছিল যেন অসীম শক্তি আমাদের সাথে আছে। কিন্তু সেই ছোট্ট আমিটিও কোনদিন ভাবিনি যে এই শক্তির প্রদর্শনীতে কেউ বাধা দেবে। আমাদের সংস্কৃতিতে এতো ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সবাই মিলে একসাথে একে অপরের উৎসব পালন করি। আমরা নিজেরাই নিজেদের উৎসবে অতিথি হয়ে যাই আর এই অতিথি পরম্পরা আমাদের সম্পর্ককে আরো মজবুত করে তোলে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যখন এত উন্নয়ন আর প্রগতির কথা বলা হচ্ছে, তখন কেন এই ধরনের হুমকি দেয়া হচ্ছে? আমাদের সমাজ কি তাহলে ভুল পথে যাচ্ছে? আমার মনে হয়, এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে অজ্ঞতা আর ভ্রান্ত ধারনা। কেউ হয়তো মনে করছে যে তার শব্দে বা তার উৎসবে বাধা আসছে অন্যের মাইক বাজানোতে। কিন্তু কিভাবে আমরা ভুলে যাই যে, আমাদের এই মাটি যুগ যুগ ধরে সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থানকে প্রশ্রয় দিয়েছে?

এখন সময় এসেছে একটা প্রশ্ন তোলার আমরা কি সত্যিই ধর্মীয় সম্প্রীতির শিক্ষা নিতে পারছি? যদি হ্যাঁ হয়ে থাকে, তাহলে কেন এই ধরনের হুমকি বা বাধা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে? আমরা কি পারি না একে অপরের উৎসবকে আরো সুন্দরভাবে পালন করতে? হয়তো আমাদের দরকার একটু সচেতনতা, একটু সহানুভূতি আর অবশ্যই কিছু বাড়তি ধৈর্য্য। বর্তমান যুগে প্রযুক্তি আমাদের অনেক সুবিধা দিচ্ছে, এই সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমরা পারি একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানাতে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। এবং এটিই সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিফলিত হয় তার ধর্মীয় সম্প্রীতির মাধ্যমে। ব্যক্তিগতভাবে, আমি মনে করি আমাদের যত ধরনের উৎসব আছে, তা শুধু আনন্দেরই নয়, এটা সহযোগিতা, সহমর্মিতা আর সম্প্রীতিরও উৎস। সমাজের সেই অংশ যারা এই ধরনের হুমকি ছড়ায়, তারা হয়তো ভুলে যায় যে, কোনো ধর্মই অন্যের আঘাতের জন্য আদৌ উৎসাহ দেয় না। বরং প্রতিটি ধর্মই শিক্ষা দেয় কিভাবে পরস্পরকে ভালোবেসে থাকতে হয়।

শেষ কথা হলো, ধর্মীয় উৎসবের মূলে থাকা উচিত ভালোবাসা, সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতি। হুমকি দিয়ে নয়, বরং একে অপরকে ভালোবেসে, সহযোগিতা করে আমরা আমাদের উৎসবগুলোকে আরো সুন্দর করতে পারি। এই প্রশ্নটি আমি আপনাদের কাছেও রাখতে চাই আমরা কি পারি না আমাদের চিন্তাভাবনায় কিছু পরিবর্তন এনে, আমাদের মনের পরিধি আরো বাড়িয়ে, আমাদের সমাজকে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত করাতে? আশা করি, আমরা পারব। আশা করি, আমাদের সমাজ একদিন সম্পূর্ণভাবে হুমকি মুক্ত হবে এবং ধর্মীয় উৎসবগুলো তাদের আসল রূপ ফিরে পাবে।

By sayan