২০২০ সালের কথা ভাবলে আমার মনে হয়, একেবারে গল্পের বইয়ের মতো একটা বছর ছিল। আর তার ভেতরেই ছিল অনেক প্রশ্ন, অনেক চিন্তা। মহামারির ছায়ায় কাটানো সেই দিনগুলোতে অনেক কিশোরই ডায়েরির পাতা কলম দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে। তবে সেই লেখাগুলির কিছু কিছু শুধু ব্যক্তিগত ছিল না, সেখানে ছিল একটা বড় প্রশ্ন ‘মহামারি গেলে কি ঘৃণা যাবে?’ বিশেষ করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু কিশোরদের জন্য এই প্রশ্নটা ছিল আরও গভীর।
শুরু করতে চাই একটা গল্প দিয়ে। আমার পরিচিত এক কিশোর, নাম রাকেশ, তার ডায়েরির ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল নিজের মনের কিছু কোণ। মহামারি যখন প্রথম শুরু হয়, তার মনে ছিল শুধু অসুস্থ হওয়ার ভয়। কিন্তু দিন পেরিয়ে যেতে থাকল, সে দেখল তার চারপাশটা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাস তার জন্য নতুন কিছু না হলেও, সেখানে বন্ধুরা তাকে হাসির পাত্রে পরিণত করতে শুরু করল। রাকেশের ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা প্রথমে ছোট কথায় শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেটা বাড়তে লাগল। রাকেশের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এটা কি কেবল মহামারির সময়ের জন্য, নাকি আমাদের সমাজ এভাবেই চলবে?
অথচ সমস্যাটা কিন্তু শুধু রাকেশের নয়। ২০২০ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু কিশোরদের ডায়েরিতে উঠে আসছিল একটাই প্রশ্ন এই ঘৃণা কি কখনো যাবে? মহামারি অনেক কিছু বদলে দিয়েছে, আমরা শিখেছি ঘরে থেকে কাজ করতে, শিখেছি কীভাবে অনলাইন মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতে হয়। কিন্তু এই বিদ্বেষ? এটা কি যাবে? মহামারি তো একদিন শেষে হবে, কিন্তু যারা মন থেকে ঘৃণা পুষে রেখেছে, তারা কি বদলাবে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু কিশোরদের মনে এই প্রশ্নের উদয় হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আমরা হয়তো দেখতে পাই না বা দেখতে চাই না, কিন্তু সমাজে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈরিতা বরাবরের মতোই রয়ে গেছে। স্কুলে, কলেজে, এমনকি ভার্চুয়াল জগতে তারা যখন তাদের ধর্ম বা জাতিসত্তার কারণে বিদ্রূপের শিকার হয়, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা কেবলমাত্র এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। মহামারির সময়ে এই বৈরিতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন সামাজিক মেলামেশা কমে যায় এবং অনলাইন মাধ্যমই একমাত্র যোগাযোগের উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
এই সমস্যার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি আছে, তা হলো ঘৃণার উৎস। আমরা আমাদের সন্তানদের কী শিক্ষা দিচ্ছি? কী ধরনের সমাজ তৈরি করতে চাই? যখনই কোনো কিশোর তার বন্ধুদের কাছ থেকে বিদ্বেষের সম্মুখীন হয়, সে শুধু তার নিজের ধর্ম বা সম্প্রদায়কে নয়, পুরো সমাজকেই ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করে। তার মাঝে জন্ম নেয় এক ধরনের অনাস্থা, এক ধরনের অবিশ্বাস। মহামারি আমাদের শিখিয়েছে, প্রয়োজনের সময় মানুষ কিভাবে একসাথে কাজ করতে পারে; কিন্তু সেই মহামারিতেও যদি ওই বিদ্বেষ থেকে থাকে, তবে এর সমাধান কী?
মনে পড়ে, মহামারির মধ্যে আমার এলাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হয়েছিল। সে বলছিল, কিভাবে তার ছোট ভাইয়ের স্কুলের ক্লাসে কেউ কেউ তার ধর্ম নিয়ে কথা তুলেছিল। এই ঘটনা তাকে খুব বিচলিত করেছিল। সে ভাবছিল, মহামারি শেষে আবার স্কুল শুরু হলে তার ছোট ভাইকে কী ধরনের পরিবেশে ফিরতে হবে। এই চিন্তাগুলো যখন কিশোরদের মনে দানা বাঁধে, তখন সেটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকে না। এটি হয়ে দাঁড়ায় একটি সামাজিক সংকট।
আমরা যদি আমাদের সমাজের এই অবস্থা সত্যিই বদলাতে চাই, তবে আমাদের সমাধানটা খুঁজতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যেই। আমাদের সন্তানদের ছোট থেকেই শেখাতে হবে, কিভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীল থাকা যায়। কীভাবে একে অপরকে সম্মান করা যায়, কীভাবে আমাদের ভিন্নতার মধ্যেও একতা খুঁজে পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, যে প্রজন্মটি আজ কিশোর, তারাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের যদি আমরা সঠিক শিক্ষা দিতে পারি, তবে হয়তো একদিন সেই ঘৃণা সত্যিই যাবে।
২০২০ সালের সেই দিনগুলোতে কিশোরদের ডায়েরিতে লেখা সেই প্রশ্ন ‘মহামারি গেলে কি ঘৃণা যাবে?’ আমাদের সবার জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় এসেছে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার। আমরা কি সত্যিই এর উত্তর খুঁজে পেতে পারবো? সমাজকে বদলাতে কি আমরা প্রস্তুত? এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি আমাদেরই হতে হবে, কারণ এটাই আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি।
