মহামারি–বর্ষ ২০২০: ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়াল ধর্মীয় বিদ্বেষ

২০২০ সাল। এক কথায় বললে, এর চেয়ে অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর একটি বছর আমাদের জীবনে আর আসেনি। করোনা ভাইরাস বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালাতে শুরু করেছিল। চারিদিকে আতঙ্কের মেঘ জমে উঠেছিল, জীবনযাপন হয়ে ওঠেছিল থমকে যাওয়া সময়ের মতো। ঠিক তখনই আরেকটি অদৃশ্য ‘ভাইরাস’ ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল ধর্মীয় বিদ্বেষ। কীভাবে? চলুন চায়ের কাপ হাতে বসে আলোচনা করি।

প্রথমেই আসি ভাইরাসের কথায়। কোভিড-১৯ নামের একটা নাছোড়বান্দা ভাইরাস যখন আমাদের সকলকে ঘরে বন্দী করে ফেলল, তখন আমরা নিজেদের মধ্যে নানান রকম আলোচনা করতে শুরু করলাম। সে আলোচনার স্রোত কিন্তু সবসময় সঠিক পথে বয়ে যায়নি। মানুষ আতঙ্কিত হয়েছিল, আর সেই আতঙ্কের স্রোতে ভেসে এসেছিল অনেক মিথ্যা তথ্য, ভুল বোঝাবুঝি আর ধর্মীয় বিদ্বেষ। একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পশ্চিমা দেশগুলোতে চিনা বংশোদ্ভূত মানুষের উপর আক্রমণ হল, তাদের দোষারোপ করা হল এই মহামারির জন্য। এমনকি আমাদের উপমহাদেশেও এই বিদ্বেষের ছাপ পড়ল। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া নানা রকম প্রপাগান্ডা মিথ্যাকে সত্যি করে তুলল।

ভাবুন তো, আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর বদলে কিভাবে একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করলাম। করোনা থেকে বাঁচার জন্য যেখানে আমাদের একসাথে লড়াই করা উচিত ছিল, সেখানে আমরা বিভাজিত হয়ে পড়লাম। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ল। আমি নিজে দেখেছি কীভাবে সামাজিক মাধ্যমে মানুষ ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এটা যেন এক ধরনের ভয়াবহ ভাইরাস। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেকক্ষেত্রেই আমরা এসব বিদ্বেষকে গুরুত্ব দিই না। মনে করতাম এটা হয়তো সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা বলল ভিন্ন কথা। এই বিদ্বেষ বাস্তবজীবনেও জায়গা করে নিল।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন

আমাদের এই বিদ্বেষের মূল কারণ হলো ভ্রান্ত ধারনা এবং মানসিক সংকীর্ণতা। আমরা একে অপরকে দোষারোপ করতে এতটাই ব্যস্ত থাকলাম যে, ভুলে গেলাম প্রকৃত পক্ষে এই মহামারির সাথে লড়াইটাই আসল। ধর্মীয় বিদ্বেষ শুধু মানুষের মনে বিদ্বেষের বীজ বপন করে, যা পরে বড় হয়ে বিষবৃক্ষে পরিণত হয়। এই সমস্যা থেকে বের হতে হলে আমাদের প্রয়োজন পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সহনশীলতা। মনে রাখতে হবে, একমাত্র সহমর্মিতার মাধ্যমেই আমরা এই ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে পারব।

এমন সময়গুলোতে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা যদি তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শেখানোর উপর গুরুত্ব দেন, তাহলে এই সমস্যা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। এছাড়া সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত নিয়মিত জনগণকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করা এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মিডিয়ারও একটি বড় দায়িত্ব আছে। মিডিয়া যদি সঠিক এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে সমাজে এই ধরনের বিদ্বেষ কমবে।

আমাদের আশাবাদী হতে হবে। যে সমাজে আমরা থাকি, সে সমাজের সকলের প্রতি আমাদের দায়িত্ব এবং ভালোবাসা থাকা উচিত। ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। একদিন হয়তো এই মহামারি শেষ হবে, কিন্তু যদি আমরা এখন থেকেই সচেতন না হই, তবে ধর্মীয় বিদ্বেষের মহামারি আমাদের সমাজে শিকড় গেড়ে বসবে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে। আমাদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বোঝাপড়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তা না হলে, একদিন আমরা বুঝতেও পারব না যে, আমরা কতটা পিছিয়ে পড়েছি।

তাহলে, এই মহামারির সময়কালে ধর্মীয় বিদ্বেষের প্রসার কিভাবে রোধ করা যায়? এর উত্তর আমাদের সবার মাঝেই রয়েছে। শক্তপোক্ত মনোভাব, সহিষ্ণুতা আর সহমর্মিতার হাত ধরে আমরা এগিয়ে চলতে পারলে, এই সংকটকালে আমরা অন্যদের পাশে দাঁড়াতে পারব। আর আমাদের নতুন প্রজন্মকে এমন একটি সমাজ উপহার দিতে পারব, যেখানে ধর্মীয় বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি এই বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেব, নাকি এর বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেব? আপনারাই বলুন, কোনটি বেছে নেবেন?

By sayan