নতুন বছরের প্রথম সূর্যোদয়। ঢাকার ধূম্রজালে ঢেকে থাকা আকাশটা কেমন যেন এক অন্যরকম স্নিগ্ধতায় আবির্ভূত হয়েছে। শহরের রাস্তাগুলি এখনো প্রায় ফাঁকা। মানুষজন আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে বেরোতে শুরু করেছে, কেউ মসজিদে যাচ্ছে ফজরের নামাজ পড়তে, কেউবা হাঁটতে বেরিয়েছে। ঠিক তেমনই গ্রামগঞ্জেও সকালের চিত্রটা একই রকম। কৃষকরা মাঠে কাজ শুরু করেছেন, তাদের হাতের কাজ আর মাটি মিশে যেন এক অন্যরকম সুরের সৃষ্টি করছে। এটাই তো নতুন বছরের প্রথম দিন। আমাদের আশা ছিল, এই বছর যেন আমাদের সমাজের জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসে, কিন্তু বাস্তবতা যেন পুরনো কাহিনীর পুনরাবৃত্তি।

২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুতেই আমরা যে ঘটনাগুলি প্রত্যক্ষ করলাম তা একেবারেই মনের শান্তিকে ভেঙে দিচ্ছে। মন্দির–বাড়িতে হামলার খবরটি শুনে মনটা সত্যিই খারাপ হয়ে গেল। এ যেন আমাদের সেই পুরনো স্ক্রিপ্টের আরেকটা নতুন অধ্যায়, যেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা আর শান্তির বিঘ্ন ঘটে। নতুন বছর আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আশা করি নতুন শুরু, কিন্তু কিছু মানুষ যেন সেই প্রাচীন ক্ষতগুলিকে খুঁড়ে তুলে নতুন করে জ্বালাতন করার পণ করেছে।

এমন ঘটনা ঘটতে দেখে ভাবনায় পড়ে যাই। আসলে আমাদের সমাজের মূল সমস্যা কোথায়? আমরা কি সত্যিই সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে করছি? নাকি আমাদের চেষ্টায় কোথাও ফাঁক ফোকর রয়ে গেছে? এমন ঘটনা যখন ঘটে, তখন কেবল মন্দির নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের চিন্তা করার সময় এসেছে, কেন এই পুরনো স্ক্রিপ্ট প্রতিবার নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসে।

আমাদের ইতিহাসই বলছে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও মিলনের মধ্যে দিয়ে আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় দেশ। এখানকার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলে মিশে একসাথে বসবাস করে। আসলে আমাদের যে জাতিগত সৌহার্দ্য, সেটা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু এ ধরনের হামলা সেই ঐক্যতাকে ভাঙতে চায়। একবার ভেবে দেখুন, একজন নিরীহ মানুষ যে তার ধর্মীয় স্থানটিকে শান্তির আশ্রয় বলে মনে করে, সেই স্থানে যদি তাকে হামলার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তার মনোবল কেমন থাকে?

আমি জানি, আপনি হয়তো ভাবছেন, এ ধরনের ঘটনা কিভাবে বন্ধ করা যায়। আপনি হয়তো এই সমস্যার সমাধান চান, কিন্তু জানেন না কিভাবে শুরু করা যায়। আসলে, এর শুরু আমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই করতে হবে। আমাদের নিজেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের শিশুদের মধ্যে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জন্মাতে হবে। পরিবারের মধ্যে আলোচনা করতে হবে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নিয়ে। সমাজের শ্রদ্ধাসম্পন্ন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে।

অন্যদিকে, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থারও দায়িত্ব নিতে হবে। তাদেরকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে এরকম ঘটনা আর না ঘটে। যারা এসব ঘটনার পিছনে আছে, তাদেরকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা হামলার শিকার হয়েছে, তাদেরকেও নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে যাতে তারা আর কখনোই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়।

আর যদি আমরা সত্যিই শান্তি চাই, তাহলে আমাদের এইসব ঘটনাকে শুধু কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। কেবলমাত্র শাস্তির বিধান করলেই হবে না, আমাদের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারের পাশাপাশি আমাদের স্থানীয় নেতাদেরও এই ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আমাদের গ্রামগঞ্জের মানুষদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং যে কোনো ধরনের বিভাজনমূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

এখনই সময় ভেবে দেখার, এই নতুন বছরটা কি সত্যিই নতুন করে শুরু হবে, নাকি সেই পুরনো স্ক্রিপ্টেই আটকে থাকবে? আমাদের উপরই দায়িত্ব এই পরিবর্তন আনার। যদি আমরা সকলে একসাথে এই পরিবর্তনের পথে চলি, তাহলে হয়তো আগামী বছরগুলোতে আমরা এমন ঘটনা থেকে মুক্তি পাব। আমাদের প্রতিজ্ঞা করা উচিত, এই নতুন বছরযেন সত্যিই নতুন কিছুর শুরু হয়, যেখানে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা এবং শান্তির বিজয় হয়। আপনারা কি আমার সঙ্গে একমত নন?