জানুয়ারি মাসটি সবে শুরু হয়েছে। শীতের চাদরে ঢাকা আমাদের দেশটা বন্ধুদের সাথে চায়ের আড্ডা দেওয়ার জন্য একদম উপযুক্ত সময়। কিন্তু আজ আপনার সাথে এক ভিন্ন আড্ডায় বসতে যাচ্ছি। বিষয়টা একটু গুরুতর, কারণ এটি আমাদের সমাজের এক গভীর সমস্যার দিকে আঙুল তুলে দেয়। আজ আমরা কথা বলব জমি দখল, মামলা-হামলা এবং থানায় ম্যানেজ করার মতো কিছু প্রবণতা নিয়ে যে প্রবণতাগুলো জানুয়ারি মাসে এক বিব্রতকর মাত্রা পায়।
জমি দখল নিয়ে শুরু করি। উত্তরাধিকার সূত্রে জমিজমা পাওয়া আমাদের দেশে একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু সেই জমির যোগ্য অধিকারী হওয়া মানেই যে আপনি সেখানে শান্তিতে থাকবেন, তা কিন্তু নয়। জমি দখলের মতো বিব্রতকর ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটে। এই দখল প্রক্রিয়ায় সাধারণত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট জমিকে তাদের অধিকারে নেয়ার চেষ্টা করে। তারা এমনভাবে কাজটি করে যাতে আইনের চোখে ধরা না পড়ে বা মামলা করেও সহজে নিরসন না পাওয়া যায়। তাদের টার্গেট সাধারণত বয়স্ক বা দুর্বল মানুষ, যারা আইনগত লড়াই চালানোর জন্য পর্যাপ্ত সংস্থান বা শক্তি পায় না।
এরপর আসে মামলা-হামলার প্রসঙ্গ। জমি নিয়ে কোনো ঝামেলা হলে, অনেকেই প্রথমেই থানায় ছুটে যান অভিযোগ করতে। কিন্তু থানায ঘুরে-ফিরে কিছু করতে না পারা অনেকের জন্যই একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা। থানার অবস্থায় যদি কাগজপত্র না থাকে বা অন্য কোনো কারণে পুলিশ সরাসরি কিছু করতে না পারে, তবে মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু মামলা করার পর এই প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ হয় যে অনেকেই হতাশায় ভুগে। আদালতের তারিখের পর তারিখে লোকজনের সময় ও অর্থের অপচয় হয়, এবং কোনো সুস্পষ্ট সমাধান না পাওয়ায় হতাশা বাড়তে থাকে।
থানায় ম্যানেজ করার বিষয়টি এখানে অবধারিতভাবেই চলে আসে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, থানার অনেক কর্মকর্তাই সাধারণত প্রভাবশালী গোষ্ঠীদের চাপে পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব বড় ভূমিকা পালন করে। অনেক সময় থানায় ম্যানেজ করার অর্থ হলো, জমি দখলকারীরা মামলায় না গিয়ে বা মামলা করার পরেও নিজেরাই থানা ম্যানেজ করে নেয়, যাতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রক্রিয়া না চালানো হয়। পুলিশ এ কাজে কখনো কখনো বাধ্য হয়, কখনো বা ইচ্ছে করেই জড়িত হয়। এ কারণে ভুক্তভোগী মানুষ থানায় অভিযোগ করেও সুবিচার পায় না।
জানুয়ারি মাসে কেন এই ধরনের ঘটনা বাড়ে? এর কারণ হলো, বছরের শুরুতে নতুন পরিকল্পনা, নতুন উদ্যোগ এবং নতুন আশার আলো দেখে মানুষ নিজের জমিজমা বা প্রাপ্য সম্পত্তি নিয়ে পরিকল্পনা করতে শুরু করে। তাই জানুয়ারিতে জমি নিয়ে বেশি মামলা-হামলার প্রবণতা দেখা যায়। এই সময়ে জমির দখল নিয়ে কুচক্রী মহল সরব হয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে।
জমি দখল, মামলা-হামলা এবং থানায় ম্যানেজ করার প্রবণতাগুলো আমাদের সমাজের অন্যায় আর দুর্নীতির মূর্ত প্রতীক। এই প্রবণতাগুলো সমাজে ন্যায়বিচারের অভাব এবং দুর্বল আইনি ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করে। তবে এর প্রতিকার কী? আমরা কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি? এর একটি সাধারণ সমাধান হতে পারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থার প্রয়োগ। মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং সেই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরো অধিক সংবেদনশীল ও দক্ষ করা প্রয়োজন।
আমরা যদি নিজেদের মধ্যে এই সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারি এবং দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দাঁড়াই, তবে একদিন অবশ্যই এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাব। সমাজের সকল স্তরে যদি আমরা ন্যায় ও নীতি মেনে চলতে পারি, তবে অন্যায়ের শৃঙ্খল ভেঙে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব হবে। আমাদের সমাজের এই গভীর সংকট থেকে মুক্তির পথ কি দেখতে পাচ্ছেন? আপনার মতামত জানতে চাই, আপনি কি মনে করেন?
