বর্ণবাদ একটি শব্দ, যার সঙ্গে আমরা সাধারণত বিদেশী প্রেক্ষাপটের কোনো ঘটনা মনে করি। কারণ বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত বা বৈষম্য নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। কিন্তু সত্যিই কি আমাদের ছোট্ট দেশটি সম্পূর্ণ মুক্ত বর্ণবাদের ছায়া থেকে? আর যদি না হয়, তবে তা কোথায় লুকিয়ে আছে?

বিষয়টা খুলেই বলছি। আজকের আলোচনার বিষয় হলো আমাদের স্কুল-কলেজের ক্লাসরুমে নীরব বর্ণবাদ। ব্যাপারটা হয়তো অনেক সময় চোখে পড়ে না, কারণ এটি খুব ছদ্মবেশী। সাইকোলজিস্টরা বলেন, বর্ণবাদ শুধু পোষাকধারী সাদা-কালো সংঘর্ষ নয়, এটি অনেক সময় আমাদের প্রতিদিনের কথোপকথন, এমনকি শিক্ষায়ও ছড়িয়ে পড়ে।

এবার একটু পেছনের দিকে তাকাই। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি কখনো ভিনদেশী বা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা নিজেদের পরিবেশে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে? আমি নিজে যখন স্কুলে ছিলাম, তখন আমার ক্লাসে একাধিক উপজাতীয় শিক্ষার্থী ছিল। তাদের দিকে তাকানোর সময় আমরা হয়তো কখনো না কখনো শুনেছি, ‘তোমাদের দেশে চলে যাও’ ধরনের বাক্য। এটি ছিল নিতান্তই মজা করার উদ্দেশ্যে বললেও এর গভীরে লুকিয়ে থাকা সত্যটা কেমন যেন কষ্টদায়ক।

গবেষণা বলছে, এমন ধরনের মন্তব্য শুধু ক্ষতিকর নয়, এটি শিশুদের মনেও গভীর প্রভাব ফেলে। শিক্ষকরা অনেক সময় এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন না বা বুঝলেও এড়িয়ে যান। কারণ, আমাদের সমাজ এখনো এ বিষয়ে অনেকটাই অজ্ঞ। তাছাড়া এই ধরনের মন্তব্য সাধারণত খেলার ছলে বা মজার ছলে দেওয়া হয়, তাই কেউ এটাকে খুব বড় করে দেখে না।

এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই ধরনের মন্তব্য করা হয়? এর কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণত অজ্ঞতা এবং ভিন্নতার প্রতি ভীতি থেকেই এই ধরনের মন্তব্যের জন্ম হয়। আমাদের সমাজে অনেক সময় একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অন্য সম্প্রদায় বা জাতিকে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন সংস্কৃতির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভেদ কমাতে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। তাদের উচিত সব শিক্ষার্থীদের সমানভাবে মূল্যায়ন করা এবং তাদের মধ্যে ভাইবোনের মতো বন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করা। তবে বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষকরা অনেক সময় এই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হন। তারা হয়তো ভাবেন, এটা বাচ্চাদের ব্যক্তিগত বিষয় বা খেলার ছলে ঘটে যাওয়া মজা, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

প্রকৃতপক্ষে, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা উচিত। কারণ এই মূল্যবোধগুলো তাদের ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্ব গঠনে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। সমাজের প্রত্যেকটি সদস্যের দায়িত্ব হলো এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আসলে, আমরা সাধারণত বর্ণবাদের বিষয়ে তেমন সচেতন নই। কারণ আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের ভিন্নতা অনেকাংশেই জাতিগত দ্বন্দ্বকে আড়াল করেছে। কিন্তু দিন দিন বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজেও বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৃদ্ধি যেন আমাদের সাম্প্রদায়িক সংহতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য আমাদের শিক্ষার মাধ্যমেই সচেতন থাকতে হবে।

আমাদের উচিত এই নীরব বর্ণবাদকে দূর করার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের ভিন্নতা মেনে নিতে শিখতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারেন। ক্লাসরুমে এমন পরিবেশ তৈরি করা উচিত যেখানে শিক্ষার্থীরা একে অপরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, শিখতে পারে এবং সম্মান করতে পারে।

যেহেতু বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, তাই আমাদের উন্নয়নের যাত্রাপথে এই ধরনের মনোভাব এক বড় অন্তরায় হতে পারে। আমরা যদি আমাদের নতুন প্রজন্মকে সত্যিকারের শিক্ষিত ও সহনশীল নাগরিক গড়ে তুলতে পারি, তবে আমাদের সমাজে বর্ণবাদের কোনো স্থান থাকবে না। আর এই যাত্রা শুরু করতে হবে স্কুল-কলেজের ক্লাসরুম থেকে।

শেষ পর্যন্ত, আমাদের প্রশ্ন করা উচিত নিজেদেরকে আমরা কি সত্যিই এমন একটা সমাজ চাই, যেখানে কেউ কাউকে বলবে, ‘তোমাদের দেশে চলে যাও’? নাকি আমরা চাই এমন একটা সমাজ, যেখানে সবাইকে এক সাথে নিয়ে চলা হবে, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকবে? আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কোনটা রেখে যাচ্ছি, সেটাই এখন ভাবার সময়।