স্বাধীনতা দিবসের সপ্তাহে যখন গোটা বাংলাদেশ স্বাধীনতার রঙে রাঙা হয়ে ওঠে, তখনই সংখ্যালঘুদের উপর হামলা আর গালিগালাজের ঘটনাগুলো যেন আমাদের মুখগহ্বরের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে যখন আমরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে উদযাপন করতে চাই, ঠিক তখনই এই ধরনের ঘটনা ঘটলে মনে প্রশ্ন জাগে– আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই বাংলাদেশ কি আজও বাস্তবে পরিণত হয়েছে?
সত্যি বলতে কি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের মধ্যে এক ধরনের গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এই গর্বিত মুহূর্তগুলোতে আমরা আমাদের সংখ্যালঘু ভাইবোনদেরও আমাদের এই আনন্দে সামিল করতে চাই। কিন্তু যখন দেখি তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে, তখন মনে হয় তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা ঠিকভাবে পালন করছি না। আমরা কি সত্যিই আমাদের সমাজকে সংখ্যালঘু-বান্ধব করে তুলতে পেরেছি?
আমার মনে পড়ে, ছোটবেলায় আমরা যখন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে স্কুলে অনুষ্ঠান করতাম, তখন আমরা সবাই মিলে একসাথে প্যারেড করতাম, গাইতাম– ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ সেই সময় আমরা কোনও ভেদাভেদ বুঝতাম না। কিন্তু বড় হতে হতে উপলব্ধি করলাম, আমাদের সমাজে কিছু জায়গায় এখনও ভেদাভেদের দেয়াল রয়ে গেছে। তবে আমরা কি সে দেওয়াল ভেঙে ফেলতে পারি না? আমাদের সংবিধানে তো এরই কসম খাওয়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা কেবল যে তাদের ক্ষতি করে তাই নয়, বরং আমাদের দেশের জন্যও এটি বড় ক্ষতির কারণ। আমরা যখন একটা স্বাধীন আর স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ গঠন করার স্বপ্ন দেখি, তখন এই ধরনের ঘটনা আমাদের সেই স্বপ্নকে খণ্ডিত করে। আমরা নিজেদের গর্বিত জাতি হিসেবে মনে করি, কিন্তু সংখ্যালঘুদের প্রতি এই অন্যায় আচরণ আমাদের জাতিগত পরিচয়ে কালিমা লেপে দেয়।
এই ধরনের সমস্যা মোকাবেলার জন্য আমাদের যে মূলত প্রয়োজন তা হলো– গভীর পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় তৎপরতা এবং জনগণের সচেতনতার মাধ্যমে একত্রিত প্রচেষ্টাই পারে এই ধরনের ঘটনার হাত থেকে আমাদের মুক্ত করতে। সরকার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বও হতে হবে এই ক্ষেত্রে সচেতন এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
আমি কিছুদিন আগে একটি ছোট্ট গ্রামের কথা শুনেছি, যেখানে সংখ্যালঘু পরিবারের উপর হামলা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন এবং মিডিয়া মিলে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, যা সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ আমাদের চারপাশে আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ শুধু মুখের কথায় নয়, আমাদের কাজেও প্রমাণ করতে হবে যে আমরা একটি একতাবদ্ধ জাতি।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি সহজে সম্ভব? অবশ্যই না। এর জন্য প্রয়োজন সার্বিক প্রচেষ্টা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের মধ্যে সংখ্যালঘুদের প্রতি সহনশীলতা এবং সম্মানবোধ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের সমাজের নেতাদের এগিয়ে এসে এই ব্যাপারে সচেতনতার বার্তা দিতে হবে। মিডিয়াকে হতে হবে আরও দায়িত্বশীল। এমনকি আমাদের পরিবারেও এই মূল্যবোধগুলো গড়ে তুলতে হবে।
আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি এবং আমাদের মন থেকে সংকীর্ণতা দূর করতে পারি, তাহলে একদিন হয়তো আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে পাবো যেখানে সব ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে উদ্দেশ্যে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, সেই উদ্দেশ্য তখনই সফল হবে।
অতএব, এখনই সময় আমাদের প্রত্যেকের একটু সচেতন হওয়ার। আমরা কি পারি না আমাদের ছোট্ট প্রচেষ্টায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে? আমরা কি পারি না স্বাধীনতার আসল অর্থ বুঝে সেই অনুযায়ী কাজ করতে? কারণ সত্যিকারের স্বাধীনতা তো সেই, যেখানে সকলেই নিরাপদ এবং সমানভাবে সম্মানিত বোধ করে। আমাদের হাতে সেই শক্তি আছে; প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই শক্তিকে সত্যিকারে কাজে লাগাতে পারবো?
