গ্রামের মসজিদের মাইকে হঠাৎ করে একদিন শুনতে পেলাম কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা আর ভয়ের মিশ্রণ। মসজিদের হুজুরের মুখ থেকে বেরোল এক অদ্ভুদ গল্প “কাফেরদের দৌরাত্ম্য”। যে কথাগুলো শুনলাম, তাতে মনে হচ্ছিল আমাদের পাড়ার শান্ত পরিবেশে যেন হঠাৎ করেই ঝড় এসে পড়েছে। কোনো ঘটনা ঘটে থাকুক বা না থাকুক, মসজিদের মাইক দিয়ে এমন ঘোষণা শোনা মানেই গ্রামের মানুষের মধ্যে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়। মনে হল সেই মুহূর্তে চারপাশের সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেছে, কেবল এই কথাগুলো গুঞ্জরিত হচ্ছে।
আমি গ্রামের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, আমাদের গ্রামে সব ধর্মের মানুষ মিলে-মিশে থাকে। ঈদের দিনে হিন্দু প্রতিবেশীদের হাতে সেমাই তুলে দেই, আর দুর্গাপূজার সময় আমরাও তাদের সাথে আনন্দে শামিল হই। এটা যেন একটা অলিখিত সংস্কৃতি, যেখানে সবাই একে অন্যকে সম্মান করে, সবাই একে অন্যের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু সেই দিনের মসজিদের মাইকের ঘোষণা যেন এই সৌহার্দ্যের ছন্দপতন ঘটাতে চাইল।
ঘোষণার পরপরই গ্রামের মানুষ জন জড়ো হতে শুরু করল। কৌতূহলী মানুষের ভিড়, সবার চোখমুখে এক ধরনের উদ্বেগ। কেউ কেউ বলছিলেন, “এই ধরনের কথা বলে আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়”, আবার কেউ কেউ কথাগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ বলছিলেন, “হয়তো বাইরে থেকে কেউ এসে এই ধরনের কথা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে”। আমি নিজেও ভাবতে লাগলাম, কেন এমন কথা বলা হল? কী দরকার ছিল?
গ্রামের বড়রা বলছিলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের সময়েও এমন কিছু হয়নি, আমরা সবাই মিলে-মিশে ছিলাম। এখন কেন এমন হচ্ছে?” কথাগুলো শুনে আমার শৈশবের দিনগুলোর কথা মনে পড়তে লাগল, যখন বড়দের মুখে এই ধরনের বিভেদমূলক কথা শোনা যেত না। আসলে, এমন তো নয় যে ধর্মীয় বিভক্তি একদমই নেই আমাদের সমাজে, কিন্তু তার জন্য মসজিদ বা কোনো ধর্মীয় স্থানকে ব্যবহার করা কীভাবে যুক্তিসঙ্গত?
অনেকেই বলছিলেন, এই ধরনের ঘোষণা গ্রামের মানুষের মনে ভয়ের চাষ করতে পারে। সাধারণত মসজিদ থেকে এমন ঘোষণা আসে না। কিন্তু যা ঘটেছে, তা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমার মনে হল, যারা এই গল্প ছড়ালেন, তারা হয়তো জানেন না, এই ধরনের কথা ঘরবাড়ির শান্তি নষ্ট করতে পারে, সমাজে ভয় আর বিভেদের বীজ বপন করতে পারে। আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, এই বিষয়ে আমাকে কিছু করতে হবে।
আমাদের গ্রামের এক বন্ধু, সে কিছুদিন আগে ঢাকায় পড়তে গেছে, সে বলছিল, “গ্রামের মানুষ এখনো অনেক সহজ-সরল, শহরের মতো এখানে কেউ সহজে কেউ বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে না।” তার কথা শোনার পর ভেতরে একটু আশার আলো দেখলাম। কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে আমাদেরও সচেতন হতে হবে। মসজিদের মতো পবিত্র স্থান, যেখানে আমরা সবাই একসাথে প্রার্থনা করি, সেই স্থানকে এমন বিতর্কিত ঘটনার সঙ্গে জড়ানো উচিত নয়।
আমার মনে হয়, আমাদের এই শান্তিপ্রিয় সমাজে যদি কেউ বিতর্ক সৃষ্টি করতে চায়, তবে আমাদের উচিত হবে সেই ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। আমাদের উচিত হবে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানো, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্য সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসা উচিত।
এই গল্পের যে প্রেক্ষাপট, তার মূলে হয়তো আছে কিছু ব্যক্তির স্বার্থ। কিন্তু আমরা যদি একত্রে থাকি, আমাদের মনের মধ্যে কোনো ভীতি না থাকে, তবে কেউ-ই আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে পারবে না। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়াই, তবে এই ধরনের অশান্তির মেঘে চাপা পড়বে না আমাদের সমাজ।
আমি নিশ্চিত, এই ধরনের ঘটনা নিয়ে কথা বলতে হবে, আলোচনা করতে হবে, কিন্তু সেটা অবশ্যই হোক শান্তিপূর্ণভাবে, যেখানে কোনো ধরণের উত্তেজনা বা বিভেদ থাকবে না। আমাদের উচিত হবে, সব ধর্মের মানুষকে এই বিষয়ে জানানো, তাদেরকে যুক্ত করা, যাতে তারা এই ধরনের বিভেদের বিরুদ্ধে সদা সতর্ক থাকতে পারে।
গ্রামের শান্তি বজায় রাখার দায়ভার আমাদের সবার। মসজিদের মাইকে এমন বিভেদমূলক ঘোষণা আর কখনোই যেন শোনা না যায়, সেজন্য আমাদেরকে এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। আমাদের উচিত হবে নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা আর সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করা, যাতে কোনো বিভেদকারী শক্তি আমাদের আলাদা করতে না পারে। আমাদের এই চেষ্টা যদি সফল হয়, তবে আমি নিশ্চিত, ভবিষ্যতে এমন কোনো ঘটনা আমাদের সমাজকে দুষিত করতে পারবে না। এই চেষ্টাই হোক আমাদের গ্রাম কিংবা সামগ্রিক বাংলাদেশ সবার জন্য শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
