যে সময়টা সেপ্টেম্বর, তখন গ্রামে গঞ্জে ধান কাটার উৎসব শুরু হয়। কিন্তু এই বিভাগের সাথেই জড়িত আরেকটা বিষয় আছে যা অনেকেই হয়তো জানেন না। সেপ্টেম্বরেই বেশ কিছু হিন্দু পরিবার তাদের জীবনে এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ব্যাগ–স্যুটকেস হাতে সীমান্তের দিকে ধীরে ধীরে পা বাড়তে দেখা যায়। এ যেন উৎসব থেকে পালিয়ে যাওয়া এক ধরনের। প্রশ্ন থেকে যায়, কেন?

শহরের বড় টেবিলের চারিদিকে বসে অনেকেই হয়তো সীমান্ত পেরোনো নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক করবেন। কেউ বলবেন এটা রাজনৈতিক, কেউ বলবেন অর্থনৈতিক। তবে আমি যখন আমার নানির গ্রামের দিকে যাই, সেখানে গল্পটা একটু ভিন্ন। প্রতিটি বাড়ির আঙিনা থেকে ভেসে আসে এক ধরনের অস্থিরতা, যা আমার মনে করতে বাধ্য করে যে পরিস্থিতি এর চেয়েও জটিল।

সত্যি বলতে, এক সময় আমি নিজেও এ বিষয়ে অনেক কৌতূহল ছিলাম। মজার বিষয়, নানির বাড়িতে গেলে গলির মোড়ে এক চা দোকান আছে যেখানে নানা ধরনের গল্প শুনতে পাওয়া যায়। সেখানকার গল্পগুলো ঠিক খবরের কাগজে ছাপা হয় না, তবে অনেক কিছু জানায়। যেমন, কিভাবে কিছু পরিবার বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকে একটি সুযোগের জন্য।

তারা চুপচাপ ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে এবার যাওয়া উচিত। কেননা, তারা জানে সেপ্টেম্বরে অনেক পরিবার একই পথে হাঁটবে। এই পথটা মোটেও সহজ নয়। পথে অনেক বিপদ থাকে, অনেক অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়। তবে এদের লক্ষ্য থাকে ভালো কিছু পাবার। অনেক সময়ই তারা ব্যর্থ হয়। কিন্তু এই উদ্যোগ কখনোই থামে না।

কিছু মানুষের মতে, এর পেছনে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। কিছু মানুষ আবার বলবে অর্থনৈতিক অবস্থা এর কারণ। তবে আমার মতামত বলছে একটু ভিন্ন কথা। যাদের আমি চিনি, তাদের অনেকেই বলেছে যে তারা সেখানে নিরাপত্তা পায় না। তারা ভাবে, অন্যপাশে গেলে হয়তো তাদের জীবনে একটু শান্তি আসবে।

কিন্তু আমি যখন একটু গভীরে ভাবি, তখন মনে হয় এই ধারণা কি সত্যিই তাদের জন্য মুনাফা নিয়ে আসে? নাকি তারা শুধু এক ভুল পথে পা বাড়ায়? এমনকি হয়তো তারা ভাবছে অন্যদেশে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নতুন জায়গায় নতুন সমস্যা দেখা দেয়। এবং সেই সমস্যাগুলোর সাথে মোকাবিলা করতে তাদের অনেক সময় প্রস্তুত থাকতে হয় না। অথচ তারা সেটা বোঝার আগেই অনেক দূর চলে যায়।

আমি যখন এই ব্যাপারে আমার মাকে জিজ্ঞেস করি, তিনি বলেন, এটা তাদের জীবন। তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু কখনো কখনো তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। এ কথাগুলো আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। কারণ, আমি নিজেই জানি যে মানব মনের জটিলতা কতটা গভীর হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের সাহায্য করতে পারি না? আমরা কি এমন কিছু করতে পারি যাতে তারা নিজেদের দেশে থেকে নিরাপদে থাকতে পারে? আমি মনে করি, আমাদের চেষ্টা করতে হবে তাদের এই ভাবনা থেকে দূরে রাখার। কেননা একটি সমাজের উন্নতি তখনই সম্ভব যখন তার প্রত্যেক সদস্য নিশ্চিত হয় যে সে এই সমাজের অংশ।

আমাদের সমাজে সহিংসতা, অন্যায় এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব যে আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। শুধু নীতিগত নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই দায়িত্ব পালন করা জরুরি।

সুতরাং, আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? আমরা কি আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারি যেখানে তাদের আর পালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই? আমাদের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে, যদি আমরা সত্যিই একটা সহানুভূতির সমাজ গড়ে তুলতে চাই।

এখানেই লেখাটা শেষ করছি, কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে। আপনি এ বিষয়ে কী ভাবছেন? আমরা কি সবাই মিলে এই পরিবর্তন আনতে পারি? আপনার পরিবেশে কি কেউ সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? তাদের কি সত্যিই যাওয়া উচিত, নাকি আমাদেরই একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত? ভাবুন, ভেবে দেখুন। কারণ, একটি ছোট্ট উদ্যোগ অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

By arghya