সকাল সকাল এক কাপ চা নিয়ে চুপচাপ বসে আছি বারান্দায়। আলো-ছায়ার খেলায় ঠিক একটা গল্পের ছবি উঠে আসছে চোখের সামনে। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে কিছু মানুষ, যারা পরিচয়ের একটা জটিল জালে আটকে গেছে ভারতে গিয়ে ‘অবৈধ’, দেশে থেকে ‘অসম্পূর্ণ নাগরিক’। তারা যেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে দুই সীমান্তের মাঝখানে। তাদের দিকে তাকিয়ে ভেবে দেখা হয়নি কখনো, কীভাবে তারা নিজেদের খুঁজে পান এই সংকটে?
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে মানুষের এক অদ্ভুত জীবনযাপন। সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে তাদের ঠিকানা। কখনো কখনো তারা ভারতে চলে যান নিজেদের উন্নত জীবন খুঁজতে, আবার কখনো ফিরতে চান নিজের শিকড়ের টানে। কিন্তু সেই পাড়ি দেওয়া যে আইনগতভাবে বৈধ নয়, সেটা হয়তো মনে রাখেন না তারা। কিছুদিন আগেই পত্রিকায় পড়লাম, ভারতের আসামে একটি বিশাল সংখ্যক বাঙালি অভিবাসীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই সেই মানুষ, যারা নিজেদের ভিটে-মাটির সন্ধানে ছুটে গেছেন ওপারে।
ভারতের নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি (NRC) নিয়ে যে হইচই, তা নিশ্চয়ই শুনেছো। বহুজনের জন্য এই তালিকা যেন এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। ভারতের সরকার বলছে, এই তালিকার লক্ষ্য অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এমন অনেক বাঙালি আছেন যারা এ তালিকায় নিজেদের নাম তোলার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। তারা কোনোদিনও ভাবেননি যে এভাবে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। আমাদের দেশের মানুষের জন্য এটা এক নতুন অভিজ্ঞতা।
অনেক পরিবারই আছে যাদের সদস্য দুই দেশের দুই প্রান্তে বিভক্ত। কিছু মানুষ ভারতের সীমানায় থেকে যান, কিছু থেকে যান এপারে। মনে মনে ভাবি, কীভাবে সম্ভব একফালি কাগজের টুকরোর ওপর এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া? কীভাবে সম্ভব একজন মানুষকে বলার, তুমি যে দেশে জন্মেছো, যে দেশের মাটি তোমার পায়ের নিচে, সেখানেও তুমি অবৈধ?
আসা-যাওয়ার এই খেলা চিরকালই চলেছে। আমাদের পূর্বসূরিরা হয়তো ভাবেননি যে একদিন এই কাঁটাতারের বেড়া এভাবে তাদের জীবন পাল্টে দেবে। কিন্তু ইতিহাস তো কেবল নীরব সাক্ষী, সে বলে না কিছু। তাই আমাদের প্রশ্ন করতে হয় সত্যিকার অর্থে আমরা কাকে বলি নাগরিক? যিনি জন্মসূত্রে, নাকি যিনি কেবল কাগজে-কলমে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সহজ নয়, কিন্তু এর গুরুত্ব অপরিসীম।
আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ যারা সেটেলের স্বপ্ন দেখে ভারতে পাড়ি জমান, তাদের বেশিরভাগই গরিব পরিবারের মানুষ। তাদের কাছে উন্নত জীবনের প্রলোভন বড় স্বপ্নের মতো। তারা ভাবেন, সীমান্ত পেরিয়ে গেলে হাতে আসবে নতুন সুযোগ, নতুন জীবন। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? তাদের অনেকেই হকার, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তারা প্রত্যেকে এক অদৃশ্য পরিচয়ের জমিতে দাঁড়িয়ে। যেদিন সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে অবৈধ বলে, সেদিন তাদের পৃথিবীটা ভেঙে পড়ে। সেই ভাঙা টুকরোগুলো কেউ তুলে ফেরত দিলে হয়তো আবার বসানো যেত, কিন্তু তা হয় কোথায়?
আমাদের দেশে এই বিষয়টি নিয়ে আরেকটি বড় সমস্যা হলো যারা ফিরে আসেন, তারা এখানে না পাচ্ছেন পূর্ণাঙ্গ নাগরিকের মর্যাদা, না পাচ্ছেন কোনো সাহায্য। সীমান্ত পেরিয়ে আসার সময় তাদের মনে হয়, হয়তো নিজের দেশে ফিরে কিছু একটা শুরু করা যাবে। কিন্তু দেশের আইনগত জটিলতা, কাগজপত্রের অভাব এবং সামাজিক বাধা তাদের জন্য এক অপরিসীম সংকট তৈরি করে।
আমাদের উচিত এই মানুষগুলোর দিকেও একটু মনোযোগ দেওয়া। তাদের জন্য থাকা উচিত একটি সংযোগের পথ, যাতে তারা আবার সমাজের মূলধারায় ফিরতে পারেন। সরকার এবং সমাজ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তাদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। যদি আমরা তাদেরকে নিজেদের মনে করি, যদি তাদের সংগ্রামের অংশীদার হই, তাহলে হয়তো এই সমস্যা থেকেই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। এটা শুধু কিছু মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যা। আমরা যদি সবাই মিলে এই সংকটকে চিহ্নিত করতে পারি, তাহলে হয়তো একটা প্রভাবিত সমাজ গড়ে তুলতে পারব। প্রশ্নটা দাঁড়ায়, আমরা কি পারব সত্যিকার অর্থে একসাথে এগিয়ে যেতে? নাকি সেই চিরাচরিত ধারণায় আটকে থাকব?
অবশেষে আমার প্রশ্নটি তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি এই যুগে দাঁড়িয়ে আমরা কি সবাই মিলে এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারবো না? কারণ যে মানুষগুলো নিজেদের পরিচয়ের লড়াইয়ে আছে, তাদের একটু সাহস, একটু সহযোগিতাই হতে পারে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমাধান। তাই আমাদের দায়িত্বের জায়গা থেকে একটু সহায়তার হাত বাড়ানো কি খুব কঠিন?
