একটা চমকপ্রদ দৃশ্যকল্প কল্পনা করুন, যেখানে আপনি আপনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং হঠাৎ শুনতে পেলেন খুব কাছেই একটা মুর্তি ভেঙে পড়েছে। তারপরে আপনার পাশেই দেখলেন আপনার প্রতিবেশীর বাড়ির জানালাগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে। এই দৃশ্য শুধু কল্পনা নয়, এটা আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতা যা আমরা অক্টোবরের পরেও নভেম্বরজুড়ে দেখতে পাচ্ছি। মূর্তি ভাঙার এবং বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা যেন লেগেই আছে এবং এর সাথে সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মামলা।
এই সব কিছু দেখে আমার মনে হচ্ছে, আমরা কি আসলেই স্বাধীন দেশে বাস করছি? যেখানে প্রতিদিন মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং আবেগ নিয়ে খেলা হতে পারে? আমরা কি সেই সমাজের অংশ যেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতার অভাব রয়েছে এবং তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা সেখান থেকে বের হতে পারছি না?
অক্টোবর মাসটা ছিল নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় ভরপুর। আমরা প্রত্যেকে এ কথা জানি যে, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় সহিংসতা বেড়েছে। কিন্তু নভেম্বর মাসেও যে তা থেমে নেই, তা আমাদের প্রতিদিনের খবরের কাগজের শিরোনাম গুলোই বলে দেয়। আর এই সহিংসতা কেবল শারীরিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের সমাজের মেরুদণ্ডেও আঘাত করছে।
ইতিহাস সাক্ষী যে, এ ধরনের সহিংসতা কখনোই ভালো কিছু আনে না। এটি শুধু সমাজের মধ্যে ভাঙন ধরে, বিভেদের নোংরা খেলাকে উস্কে দেয়। আর তা থেকে জন্ম নেয় নতুন নতুন সমস্যা ও মামলা। এসব মামলার মধ্যে কিছু প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে হলেও, অনেক ক্ষেত্রেই নিরপরাধ মানুষকে জড়িয়ে দেয়া হয়, যার ফলে প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এসবের মধ্য দিয়ে ভুক্তভোগী শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো একটি সমাজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, এই সামাজিক অবস্থা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে? আমরা কি আমাদের সন্তানদের এমন একটা সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে বড় হতে দিতে চাই, যেখানে সহিংসতা আর ভয়ভীতি রয়েছে? যেখানে তাদের নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে বারবার বাধার সম্মুখীন হতে হয়? এটা আমাদের প্রত্যেকের জন্যই বড় একটা প্রশ্ন।
এসবের মধ্যেও এমন কিছু মানুষ আছেন যারা এই সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস রাখেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা এত নগণ্য যে তারা খুব সহজেই হারিয়ে যায় সহিংসতার স্রোতে। তবে এর মানে এই নয় যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবো। আমাদের উচিত এই সহিংসতার বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তোলা, নিজেদের সচেতন করা এবং অন্যদের সচেতন করা। প্রয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করা এবং সহিষ্ণুতার মডেল তৈরি করা।
একটা সময় ছিল যখন আমরা গর্ব করতাম আমাদের দেশের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নিয়ে। আমাদের বৈচিত্র্যই ছিল আমাদের শক্তি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সেই গর্ব যেন হারিয়ে যাচ্ছে। সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করার পেছনে কারা আছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
যদি আমরা পিছন ফিরে তাকাই, দেখবো যে ইতিহাস বারবার আমাদের সতর্ক করেছে। সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান আনে না, বরং সেটাকে আরও জটিল করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত সহিংসতার বিরোধিতা করা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে উৎসাহিত করা এবং সহিষ্ণু সমাজ গঠন করা। শুধু আইন বা প্রশাসন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন, জনসচেতনতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।
আমাদের মনে রাখা উচিত, প্রতিটি মূর্তি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মূল্যবোধও ভাঙছে। প্রতিটি বাড়ি ভাঙচুরের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজের ভিত্তিও দুর্বল হচ্ছে। আর প্রতিটি নতুন মামলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও পিছিয়ে পড়ছি শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে।
তাহলে, আমরা কি এই সহিংসতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবো? আমরা কি পারবো একে অপরকে সম্মান করতে এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে? এটা আমাদের নির্ভর করছে। সময় এসেছে আমাদের সচেতন হওয়ার এবং সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়ার। আমাদের আদর্শকে পুনর্গঠিত করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে আমরা এই সমাজের অংশ যা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব বহন করে। ভবিষ্যতের একটি সুন্দর, সহিষ্ণু এবং শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে আমাদের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। আপনি কি প্রস্তুত সেই পরিবর্তনের অংশ হতে?
