শিরোনাম শুনেই যা মাথায় আসে, তা হলো আমাদের বর্তমান সমাজের একটা অদ্ভুত বাস্তবতা। “হামলার ভিডিও ভাইরাল, কিন্তু আসামি ‘অজ্ঞাত’: তদন্তের গতি থমকে থাকে” এই ধরনের ঘটনা যেন আজকাল একপ্রকার নিত্য নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যেকোনো সামাজিক মাধ্যম খুললেই দেখে ফেলবেন একের পর এক ভিডিও, যেখানে আমরা নানান অপরাধের সাক্ষী হতে পারি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই অপরাধের তদন্তে আসামি হয়ে উঠে ‘অজ্ঞাত’। এটা যেন একটা সিস্টেমেটিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা যারা সচেতন, তারা নিশ্চয়ই জানি যে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের হামলা বা অপরাধের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। এই ভিডিওগুলো কোনো এক সাহসী ব্যক্তি তুলেন, যিনি এইটুকু তো নিশ্চিত করতে পারেন যে আমরা, দর্শকরা, কী ঘটেছিল তা নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এই ভিডিওগুলো শুধুমাত্র আমাদেরকে সচেতন করাই নয়, বরং এদের রয়েছে আরো অনেক তাৎপর্যপূর্ণ দিক। এগুলো সাধারণত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে সহায়ক হতে পারে। অথচ, বাস্তবতার ময়দানে আমরা দেখি এই ভিডিওগুলো প্রায়ই শুধু ভাইরাল হয়েই থেকে যায়। তদন্তের ধীর গতিতে একসময় এই ঘটনাগুলো ভুলে যেতে তাকায়, আর অপরাধীরা থেকে যায় অজ্ঞাত।
ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, এই ধরনের ঘটনাগুলো আমাকে সবসময় উদবিগ্ন করে। আপনি যখন এমন কিছু ভিডিও দেখেন, তখন প্রথমেই মনে হয় এদের পেছনের মানুষগুলোকে খুঁজে বের করা উচিত। কিন্তু আমাদের সমাজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এর পেছনে কতখানি দক্ষতার সাথে কাজ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আপনি হয়তো ভাবছেন, এত উচ্চ প্রযুক্তির যুগে যেখানে সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, সেখানে কেন আসামিরা থেকে যাচ্ছে অজ্ঞাত? এটা কি আমাদের দক্ষতার অভাব, না কি এর পেছনে আরও গভীর কোনো সমস্যা লুকিয়ে আছে?
মূলত, এই ধরনের ভিডিওর ব্যাপারে দু’টি দিক বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আসামি শনাক্ত করতে না পারা। আর দ্বিতীয়ত, যদি শনাক্ত করা যায়ও, তাহলে তাদের বিচারের আওতায় আনার জটিলতা। বাংলাদেশে এসব ঘটনা যে একেবারে নতুন কিছু নয়, তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু বিশেষ করে যে ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ভাইরাল হয়, সেগুলো কেন অপরাধীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়, তা নিয়ে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়।
অনেকেরই হয়তো মনে হতে পারে, তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে এত ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা এই তদন্তগুলোতে সফল হতে পারছি না। আসলে, এটা শুধুই প্রযুক্তির কৌশলগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এর পেছনে আরো অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। প্রথমত, আমাদের দেশে যে পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়, তার তুলনায় আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়। আর সেজন্য অনেক সময়েই তারা এই ধরনের ভিডিও থেকে সঠিক তথ্য বের করে আনতে ব্যর্থ হয়।
ধারণা করুন, আপনি যদি কোনো অপরাধের ভিডিও দেখেন, তখন আপনার মনে হতে পারে যেই দেখছেন সেই অপরাধী। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ধরনের ভিডিও অনেক সময় স্পষ্ট নয়, বা হয়তো অপরাধীরা মুখোশ পরিহিত থাকে। এতে তাদের শনাক্ত করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। আর অপরাধীদের কৌশল এতই উন্নত যে তারা প্রযুক্তির সব সুবিধাকে নিজের পক্ষে কাজে লাগায়।
অন্যদিকে, আমাদের দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি ও জটিলতা অনেক সময় অপরাধীদের লুকিয়ে থাকার সুযোগ দেয়। এদিকে আমাদের বিচারিক প্রক্রিয়াও এক প্রকার দুর্বল। অনেক সময় মামলা গড়াতে গড়াতে বছর পার হয়ে যায়, ফলে অপরাধীরা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। এভাবে একসময় আমরা ভুলে যাই সেই অপরাধ এবং তার সাথে জড়িত অপরাধীদের।
আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বিষয়ে আরো কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি, আমাদের জনগণকেও আরো সচেতন হতে হবে। যে ব্যক্তি এই ভিডিও তুলে ধরে তাদের সুরক্ষা ও করণীয় বিষয়েও সচেতন করতে হবে। একমাত্র এভাবেই আমরা এই ধরনের অপরাধীদের দায়িত্বে নিতে সক্ষম হবো।
তাহলে, প্রশ্ন হলো, এই ধরনের সমস্যা সমাধানে আমাদের করণীয় কী? হয়তো আমাদের উচিত প্রযুক্তিগত উন্নতি বাড়ানোর পাশাপাশি এক ধরনের সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করা, যেখানে জনগণই হবে পুলিশের চোখ ও কান। আমাদের উচিত সবাই মিলে একসাথে এই সমস্যার সমাধানে কাজ করা। আমাদের উচিত এই ভিডিওগুলোকে কেবলমাত্র ভাইরাল না করে, বরং আপনি যখনই এমন কিছু দেখবেন তখনই তা সঠিক কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেওয়া। কারণ, আমরা যদি এক সময় এই ভিডিওগুলোকে শুধুই ভাইরাল হিসেবে দেখি, সেটা আমাদের সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বয়ে আনবে।
শেষে আমি সবাইকে আহ্বান জানাবো, আসুন আমরা সবাই সচেতন হই এবং মিলিত প্রচেষ্টায় এই ধরনের সমস্যার সমাধান করি। আপনার মতামত কি? আপনি কি মনে করেন যে আমাদের বর্তমান সমাজ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম?
