দেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার আগে এক কাপ চা হাতে নিয়ে বসে পড়ুন। না, এই কথা বলছি না যে চায়ে চুমুক দিলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। তবে আমাদের দেশের মানুষ যেভাবে চায়ের কাপ হাতে রাজনীতির বিশ্লেষণে মগ্ন হয়ে যায়, তাতে অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। আজকের লেখাটাও ঠিক তেমনই রাজনীতি, ষড়যন্ত্র এবং ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর নিয়ে বিশ্লেষণ করতে চাই।
সম্প্রতি এক সরকারি ভাষ্য থেকে শুনতে পেলাম যে কিছু ষড়যন্ত্রকারী পরিকল্পিতভাবে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। অথচ ভুক্তভোগীরা বলছে, আমরা তো আগেই সতর্ক করেছিলাম। এখানে একটা বড় ধাঁধা আমার মতো সাধারণ মানুষের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কাদের কথা সত্য? সরকারের নাকি সাধারণ মানুষের? একটু খোলাসা করে বলার চেষ্টা করি।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু অসাধু চক্র দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজ করছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, ষড়যন্ত্র কি এক দিনে হয়? এমন তো হতে পারে না যে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা শুরু হলো আর কাল সকালেই তা কার্যকর হয়ে গেল। ষড়যন্ত্রের একটা প্রক্রিয়া থাকে, তার জন্য সময় লাগে। তাছাড়া তদন্তের পরিণতি যদি সত্যিই ষড়যন্ত্রকারীদের অপরাধ প্রমাণ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সবসময় একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। অপর দৃষ্টিকোণও বিবেচনা করা জরুরি।
আচ্ছা, ভুক্তভোগীদের কথায় আসি। তারা কিন্তু একদিন দুইদিনের জন্য অভিযোগ করছে না। তাদের কণ্ঠে বারবার শোনা যাচ্ছে তারা আগেও সতর্ক করেছিল। প্রশ্ন হলো, তারা যখন অভিযোগ করছিল তখন কেন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি? আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সমস্যা হলে, তারা প্রথমে নিজেরাই সমাধানের চেষ্টা করে। কিন্তু যখন তা সম্ভব হয় না তখনই তারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়। আর সেই সময় যদি প্রশাসন তাদের কথা গুরুত্ব না দেয়, তাহলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা আমাদের সামনে আজকের এই বাস্তবায়নের চিত্র।
ভুক্তভোগীদের একটি অংশের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাদের কণ্ঠে আবেগের পাশাপাশি কিছুটা হতাশাও লুকিয়ে ছিল। তারা বলছিল যে, সম্ভবত প্রশাসন তাদের নালিশকে শুরুতেই গুরুত্ব দিয়েছিল না। আর তাই তাদের আজকের অবস্থায় এসে দাঁড়াতে হয়েছে। একজন ভুক্তভোগী মহিলার কথায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তিনি বললেন, “আমরা শুধু আমাদের কষ্টের কথাই বলেছিলাম, কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনেনি। এখন যখন সমস্যা বড় হয়েছে, তখন আমাদের কথা মনে পড়েছে।”
এখন প্রশ্ন হলো, এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কি আমাদের প্রশাসনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে? এর উত্তর খুঁজতে আমাদের একটু অতীতে ফিরে যেতে হবে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে ভুল পরিকল্পনার কারণে জনগণ ভুক্তভোগী হয়েছে। কিন্তু, এই ভুল থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারিনি। প্রতিবারই কেবল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজে বেড়াই।
অন্যদিকে, ষড়যন্ত্রকারীদের কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও জরুরি। তারা যদি সত্যিই দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে, তবে তাদের উদ্দেশ্য কী? রাজনৈতিক সুবিধা লাভ করা? আর সেই সুবিধা পেতে তারা দেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে প্রস্তুত? এ ধরনের কাজ যে কোনো দেশের জন্যই বড় ধরনের ক্ষতিকারক হতে পারে। তাই এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জনগণের শান্তি বিঘ্নিত না হয়।
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটা দেশের স্থিতিশীলতা জনগণের উন্নতির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। যদি জনগণ শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে থাকে, তবে দেশের উন্নয়নও দ্রুত হয়। কিন্তু যখন ষড়যন্ত্র এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তখন জনগণ প্রথমে নিরাপত্তা সংকটে পড়ে। আর এই অসমাপ্ত পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠই হয় সবচেয়ে সত্য। কেননা ভুক্তভোগীরাই সরাসরি পরিস্থিতির ভয়াবহতার মোকাবিলা করে।
আমার প্রশ্ন, তাহলে আমরা কি এমন একটি দেশ চাই যেখানে সাধারণ মানুষের কথা গুরুত্ব পাবে না? যেখানে ষড়যন্ত্র আর রাজনৈতিক খেলাগুলোই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে? না, নিশ্চয়ই এমনটা আমরা কেউ চাই না। তাহলে কেন আমরা আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী এবং জনবান্ধব করতে পারছি না? কেন আমরা জনগণের কণ্ঠকে গুরুত্ব দিচ্ছি না?
এই লেখার উপসংহার হিসেবে বলছি, আমাদের এখনই সময় এসেছে নিজেদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার। জনগণের কথা শুনতে আমাদের সময় দিতে হবে। আর ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, যদি তারা সত্যিই দেশের ক্ষতি করার চেষ্টা করে থাকে। তবে, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, কোনো সমস্যার সমাধান কেবলমাত্র একপাক্ষিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্ভব নয়। জনগণের কথা শুনে, তাদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে এবং সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করেই কেবলমাত্র একটি স্থিতিশীল দেশের স্বপ্ন দেখা যেতে পারে। আজকের এই পরিস্থিতি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের। তাহলে আপনি কী মনে করেন, প্রশাসন কি জনগণের কথা শুনবে?
