একটা জায়গা যখন আপনার নিজের হয়, সেটার সাথে একটা আলাদা ধরণের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেটা যে মন্দির হোক, কিংবা বাড়ি, নিজের জায়গা একদম আলাদা অনুভূতি দেয়। কিন্তু কেমন হয় যদি সেই নিজের জায়গা হারাতে হয়? বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই এই দুঃখের গল্প বলতে পারবেন। তাদের অনেকে মন্দির–বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে গাদাগাদি করে জীবন পার করছেন।
বিশ্বাস করুন, এই রকম জীবনের কষ্ট বুঝতে হলে নিজে অনুভব করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করা এটা কেবল কথা বলে বোঝানো যাবে না। আরেকটা কথা বলি, মানুষের মনে যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়, সেটা সারানোর ক্ষমতা কারো থাকে না। আমাদের সমাজে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয় না বললেই চলে। আচ্ছা, কেমন হয় যদি আজ কিছু কথা বলি?
বাংলাদেশে, বিশেষ করে গ্রামের দিকে, একটি বাড়ি কেবল বাড়ি নয়, বরং একটি সামাজিক অবস্থান। সেখানে সেই বাড়িটাই কর্তৃত্বের প্রতীক। কিন্তু যখন এই প্রতীক হারিয়ে যায়, তখন মানুষের জীবনে একটা বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। আমি নিজে এমন অনেক মানুষ চিনি, যারা কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মন্দির–বাড়ি হারিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা তাদের জীবনের সবকিছু বদলে দেয়। তারা আত্মীয়ের বাড়িতে গাদাগাদি জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
এখন আপনি বলবেন, আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকা তো খারাপ কিছু নয়। হ্যাঁ, সেটা আপাতত সত্য। তবে একটা বিষয় নিশ্চয়ই বুঝবেন, কেউ যদি নিজের বাড়ি থেকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে উচ্ছেদ হয়, তা তাকে কতটা ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আত্মীয়দের বাড়ি গিয়েও শান্তি মেলে না। কারণ সেই জায়গা তো নিজের নয়। সেখানে অতিথি হয়ে থাকতে হয়। নিজের মতো করে কিছু করা যায় না।
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেরই এই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা রয়েছে। মন্দির ভিত্তিক জগৎ তাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু যখন সেই মন্দির এবং ঘর তাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন তারা কেবল ধর্মীয় নয় বরং মানসিক ও সমাজিক চাপের মধ্যে পড়ে যান।
আমি মনে করি এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে এখনও ধর্মের নামে হিংসার শিকার সীমাহীন। রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন দিক থেকে এই বিষয়গুলোকে সমাধান করা জরুরি। মন্দির বা ঘর কেবল ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়, বরং এটা একটি মানুষের পরিচয়, একটি পরিবারের ইতিহাস।
আমার অভিজ্ঞতাতেও দেখেছি, উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোর জীবনে আর্থিক এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা প্রকট হয়ে ওঠে। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়, সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কী ধরণের জীবনযাত্রা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
এখন প্রশ্ন আসে, আমরা সবাই কী করতে পারি এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য? প্রথমত, আমাদের দরকার ধর্মীয় সহনশীলতা। সবাইকে নিজের ধর্ম পালনের সুযোগ দিতে হবে, সেটা হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ যে কেউ হতে পারে। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত ধর্মীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে কেউ এই ধরনের উচ্ছেদের শিকার না হয়।
এছাড়া আমাদের সমাজেও পরিবর্তন আনতে হবে। ধর্মের নামে কেউ যেন কোনো অন্যায় কার্যকলাপ করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদেরকে সচেতন হতে হবে এবং নিজেদের মধ্যে যে দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি একসাথে কাজ করি এবং সঠিক উদ্যোগ নেই, তাহলে আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারব। তবে এজন্য দরকার হবে সচেতনতা, সমবেদনশীলতা এবং কার্যকরী পদক্ষেপ।
আসুন, আমরা সবাই এই বিষয়ে ভাবি এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করি। আমাদের সকলের লক্ষ্য হোক একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কেউ উচ্ছেদ হওয়ার ভয় নিয়ে বাঁচবে না। আপনার কী মনে হয়? আমরা কি পারব?
