রাতের অন্ধকারে মন্দিরে হামলা, ভোরে প্রশাসনের ‘অজ্ঞাত’ মামলা

আমি এখন যে গল্পটি বলতে যাচ্ছি, তা আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে। গল্প নয়, এক বাস্তব ঘটনা। এটা শুধু একটি মন্দিরে হামলার ঘটনা নয়, এটি আমাদের মানসিকতার একটি প্রতিফলন, যেখানে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা একসাথে মিলে সমাজের শৃঙ্খলাকে ভেঙে দেয়। বাংলাদেশে বাস করে এমন হিন্দু সম্প্রদায় প্রায়শই তাদের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে হামলার শিকার হয়। এই নিয়ে আমরা বহুবার খবরের পাতা উল্টিয়েছি, তবে কি কোনদিন সিরিয়াসলি ভেবেছি?

সেদিন ছিল এক শান্তিপূর্ণ রাত। গ্রামের মানুষ ঘুমিয়ে আছে, কেউ জানে না তাদের আশেপাশে কত বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। হঠাৎ রাত তিনটার দিকে শোনা গেলো এক ভীতিকর আওয়াজ। আগুনের শিখা, চিৎকার, আর কান্নার মিশ্রণে সেই রাতটা হয়ে উঠলো এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। গ্রামের মন্দিরটিতে হামলা হলো, ভাঙচুর হলো, পবিত্র মূর্তিগুলোকে আঘাত করা হলো। সেখানে উপস্থিত ধর্মপ্রাণ মানুষের চিৎকার ও কান্নার ধ্বনি রাতের নীরবতাকে বিদীর্ণ করেছিল।

কিন্তু এই ভয়ানক ঘটনার চেয়েও অবাক করার বিষয় ছিল পরদিন সকালে প্রশাসনের কার্যকলাপ। সকালে যখন গ্রামের মানুষ প্রশাসনের কাছ থেকে সাহায্য চাইল, তখন তারা জানালো, তারা কোনো কিছু জানেনা। কি আশ্চর্য! হাজার হাজার মানুষ দেখলো এই হামলা, কিন্তু প্রশাসন জানে না। অসম্ভব! ‘অজ্ঞাত’ মামলা দায়ের হলো। অপরাধীর সংখ্যা ছিল অসংখ্য, কিন্তু মামলা হলো ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তিদের নামে।

প্রশ্ন হলো, প্রশাসন কি সত্যি জানে না? নাকি তারা জানলেও কোন এক অদৃশ্য শক্তির কারণে চুপ করে আছে? এদেশের মানুষ যেখানেই কিছু ঘটুক না কেন, প্রশাসন সবসময় একটি অজুহাত খুঁজে পায়। আর সেটা হলো, ‘অজ্ঞাত’ মামলা।

তাহলে আমরা কি করছি? আমরা কি এসব মেনে নিয়ে, কিছুদিন পর এই ঘটনা ভুলে যাচ্ছি? আমরা কি সত্যি এতটাই অসহায় যে এই ধরনের হামলার বিরুদ্ধে এক হয়ে দাঁড়াতে পারছি না? প্রশাসন যদি নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষ কি কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে না?

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের সংবিধানের প্রথম পাতাতেই লেখা আছে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ আমাদের অন্যতম মূলনীতি। তবে বাস্তবিকেই কি আমরা ধর্মনিরপেক্ষ? নাকি আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ?

এদিকে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা জানি, ধর্মীয় নেতারা নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। কিন্তু তারা কি করছেন? তারা কি নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষকে সংযত থাকতে বলছেন? তারা কি শান্তি এবং সমঝোতার বার্তা দিচ্ছেন? সম্ভবত নয়। বরং অনেক সময় তাদের বক্তব্যই এই ধরনের হিংসাত্মক ঘটনার মূলে থাকে।

এই জায়গায় আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করা দরকার। আমাদের সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস, যা নিয়ে কাউকে আঘাত করা উচিত নয়। আমাদের সেই মনোভাব গড়ে তুলতে হবে যেখানে প্রতিটি ধর্মাবলম্বী মানুষ অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।

এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য আমাদের প্রয়োজন একটি যৌথ প্রয়াস। প্রশাসনকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে, এবং আমাদের সমাজের প্রতিটি সদস্যকে একত্রিত হতে হবে। আমাদের সন্তানদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। অন্যথায় এই ধরনের ঘটনা ঘটে চলবে, এবং আমরা শুধুমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকব।

তো, আমি আপনাদেরকে একটা প্রশ্ন রেখে এই লেখাটা শেষ করতে চাই। আপনি কি ভাবছেন? এই পরিস্থিতি বদলানোর জন্য আপনি কি কিছু করবেন? নাকি আপনি চুপচাপ বসে থাকবেন, আর একটা অজ্ঞাত মামলার গল্প শোনার জন্য অপেক্ষা করবেন? হয়তো আজকের দিনে আমাদের সবার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন। সময় এসেছে আমাদের সমাজের জন্য কিছু করার। সতর্ক থাকুন, সচেতন থাকুন এবং একত্রিত হোন। হয়তো একদিন এই অন্ধকার মুছে গিয়ে একটি আলোকিত সমাজ গড়ে উঠবে আমাদের সামনে।

By rimjhim